কলকাতায় বেআইনি রক্ত পাচার চক্রের পর্দাফাঁস! বন্ধ হল ‘পিপলস ব্লাড ব্যাংক’

রাজ্য জুড়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও কাটমানির বিরুদ্ধে সম্প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। সেই হুঁশিয়ারির পরপরই কলকাতার নামী ব্লাড ব্যাংক ‘পিপলস ব্লাড ব্যাংক’-এর বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে রক্ত ও প্লাজমা পাচারের অভিযোগ উঠে এল। সরকারি নির্দেশিকা ও নিয়মকানুনকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ করার অভিযোগে অবশেষে বন্ধ করে দেওয়া হল হাজরার এই বিতর্কিত বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকটি। স্বাস্থ্য দফতরের স্পষ্ট নির্দেশ, এখন থেকে তারা আর ইনহাউস বা নিজেদের কেন্দ্র থেকেও কোনো রক্ত সংগ্রহ করতে পারবে না।
এর পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় আইনি নথি ও পরিকাঠামো না থাকায় নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার ২৮টি ডায়াগনাস্টিক সেন্টারকেও বন্ধের নোটিস ধরিয়েছে প্রশাসন।
রক্ত পাচারে প্রায় ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতির আশঙ্কা: হাসপাতালে এক ফোঁটা রক্তের জন্য যখন মুমূর্ষু রোগীদের স্বজনদের হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়, তখন এই অমূল্য রক্ত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো ঘৃণ্য অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, রাজ্যে বেআইনি রক্ত পাচার ও বিক্রির পেছনে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিশাল দুর্নীতি জড়িয়ে রয়েছে। এর আগে এই অভিযোগে ১১টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার হাজরার ‘পিপলস ব্লাড ব্যাংক’ কর্তৃপক্ষকে সমস্ত নথিপত্রসহ স্বাস্থ্য ভবনে তলব করা হয়। কাগজপত্র ও তথ্য খতিয়ে দেখার পর ব্লাড ব্যাংকটি চিরতরে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য দফতর।
স্বাস্থ্য ভবনের সারপ্রাইজ ভিজিট ও চাঞ্চল্যকর তথ্য: স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে মোট ৫৭০টি শিবির থেকে প্রায় ৪২,৯০০ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করেছিল এই পিপলস ব্লাড ব্যাংক। কিন্তু সরকারের কাছে কোনো ‘নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) না নিয়েই, রাজ্যকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে গত ৬ মাসে প্রায় ৩.৫ কোটি টাকার প্লাজমা ভিনরাজ্যে পাচার ও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে সোমবার স্বাস্থ্য দফতরের উচ্চপদস্থ কর্তারা ব্লাড ব্যাংকটিতে আচমকা হানা দেন। পরিদর্শনে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ আধিকারিকদের! দেখা যায়, রক্ত কিংবা প্লাজমা সংরক্ষণের জন্য ন্যূনতম বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামোই সেখানে নেই। ফ্রিজারের মধ্যে অত্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈজ্ঞানিক উপায়ে বিপুল পরিমাণ রক্ত ও প্লাজমা ঠেসে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, জমা করে রাখা এই হাজার হাজার ইউনিট রক্তের বেশিরভাগের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজই (৫ আগস্ট)। সঠিক পরিকাঠামো না থাকায় এবং বেআইনি কারবারের চক্করে পড়ে এতগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম এই বিপুল পরিমাণ রক্ত এখন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল।