দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভাষণ: কী লিখল বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম? বয়কট, ক্ষোভ নাকি আত্মরক্ষার কৌশল!

ঢাকা / কলকাতা: গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে আয়োজিত একটি প্রেস কনফারেন্সে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ভার্চুয়ালি প্রকাশ্যে আসেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তাঁর এই বক্তব্য সম্প্রচারে আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন। ঢাকার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এটি একটি বেসরকারি সংস্থার আয়োজন, যার সাথে ভারত সরকারের সরাসরি কোনো যোগ নেই।
দিল্লির এই ইভেন্টের পর বাংলাদেশে নতুন করে চড়তে থাকে উত্তেজনার পারদ। একদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে বিরোধীদের তাণ্ডব। এমনকি ওই ভার্চুয়াল সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়িতেও রাতে আগুন ও বোমাবাজির খবর সামনে আসে।
এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দিল্লি ইভেন্টকে কীভাবে দেখল বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলি? বৃহস্পতিবার প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমই সরকারি ক্ষোভ ও বিরোধী প্রতিক্রিয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছে।
‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর ক্ষুব্ধ সুর:
বাংলাদেশের অন্যতম প্রচারিত এই দৈনিকটি প্রথম পাতাতেই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। তাদের প্রধান শিরোনাম ছিল: ‘দিল্লির অনুষ্ঠানে দণ্ডিত হাসিনাকে বক্তব্যে অনুমতি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া’। এতে সরকারের অসন্তোষকেই মূলত হাইলাইট করা হয়।
‘প্রথম আলো’-র রহস্যময় নীরবতা:
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ শেখ হাসিনার মূল বক্তব্যের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গেছে। তার বদলে তারা ফোকাস করেছে সাকিব আল হাসানের বাড়িতে হামলার সংবাদের ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, সেন্সরশিপের ভয় কিংবা জনগণের ক্ষোভকে তুলে ধরতেই হাসিনার ভাষণ এড়িয়ে গেছে তারা।
‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর তোপ:
ইত্তেফাক প্রধানত হাসিনা-বিরোধী মন্তব্যগুলোকে লিড নিউজ হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য— “আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারণ করবে আদালত” এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের কড়া সমালোচনা— “নিজের দায় স্বীকার না করে দলকে বিভ্রান্ত করছেন হাসিনা”— এসব খবরকেই তারা সামনে এনেছে।
‘কালের কণ্ঠ’ ও ‘যুগান্তর’-এর সরকারি অবস্থান:
‘কালের কণ্ঠ’ সংবাদপত্রটি বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষুব্ধ বিবৃতিকে প্রধান খবর করেছে। হাসিনার বক্তব্যের সারাংশ তারা চেপে গেছে। একইভাবে ‘যুগান্তর’-ও সোহেল তাজের আক্রমণাত্মক মন্তব্যকে প্রথম পাতায় ঠাঁই দিয়ে নেতিবাচক কভারেজ বজায় রেখেছে।
ইংরেজি দৈনিকগুলোর কৌশল (‘ঢাকা ট্রিবিউন’ ও ‘বাংলাদেশ পোস্ট’):
ইংরেজি সংবাদপত্র ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ সুচতুরভাবে হাসিনার বক্তব্য বাদ দিয়ে বিএনপি সরকারের ক্ষোভ প্রকাশকে ‘পেজ ওয়ান লিড’ করেছে। অন্যদিকে, ‘বাংলাদেশ পোস্ট’ জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমানের কড়া হুঁশিয়ারিকে প্রাধান্য দিয়েছে, যেখানে তিনি নতুন একটি বিপ্লবের ইঙ্গিত দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবেশ আরও গরম করে তুলেছেন।
সারসংক্ষেপ:
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর কভারেজ স্পষ্ট করে দেয় যে, সেন্সরশিপের চাপ এবং সরকারের অসন্তোষের কারণে শেখ হাসিনার বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল ঢাকার প্রায় সমস্ত শীর্ষ সংবাদপত্র।