আত্মরক্ষায় কি কেনা যাবে বন্দুক? পশ্চিমবঙ্গে অস্ত্র লাইসেন্স পাওয়ার আসল নিয়ম ও শর্তগুলো জেনে নিন
সিনেমার রুপালি পর্দায় বা পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে বন্দুক দেখতে আমরা অভ্যস্ত। কখনো আবার অপরাধমূলক নানা সংবাদের সূত্র ধরেও বেআইনি অস্ত্রের কথা কানে আসে। সম্প্রতি তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রের জন্য আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে প্রশ্ন হলো—একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনি কি আত্মরক্ষায় বন্দুক কিনতে পারেন?
উত্তর হলো—হ্যাঁ, ভারতের আইন মেনে নির্দিষ্ট শর্তপূরণ সাপেক্ষে সাধারণ নাগরিকরাও ফায়ার আর্মস বা আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারেন। ১৯৫৯ সালের অস্ত্র আইন (Arms Act, 1959) এবং ২০১৬ সালের অস্ত্র বিধি (Arms Rules, 2016) অনুযায়ী ভারতে মূলত তিনটি ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়: ১. আত্মরক্ষা (Self Defense) ২. ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা (Business Security) ৩. শুটিং খেলাধুলো (Sports Shooting)
১. আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্স পাওয়ার শর্ত:
ব্যক্তিগত জীবন বা সম্পত্তি রক্ষায় বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে—এমন ব্যক্তিরাই এই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। শুধু মুখিক দাবি নয়, আবেদনের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জমা দিতে হয়:
- এফআইআর (FIR) বা জেনারেল ডায়েরি (GD)-র কপি।
- পূর্বে কোনো আক্রমণ, হুমকি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হলে তার পুলিশি রেকর্ড।
- হুমকি চিঠি বা ডিজিটাল বার্তার প্রমাণ।
- এছাড়া কোনো সংবেদনশীল সরকারি পদ বা বিশেষ সামাজিক অবস্থানের কারণে জীবন সংশয় থাকলে আবেদন করা যায়। সাধারণত এ ক্ষেত্রে Non-Prohibited Bore (NPB) ক্যাটেগরির পিস্তল, রিভলবার বা শটগানের লাইসেন্স পাওয়া যায়।
২. ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য:
যেসব ব্যবসায়ে নগদ অর্থ বা বিপুল মূল্যের সামগ্রী লেনদেন হয় (যেমন: গয়নার দোকান, ব্যাংক, ক্যাশ ট্রেডিং এজেন্সি, পেট্রোল পাম্প বা বড় ডিস্ট্রিবিউটর), তারা নিজস্ব সুরক্ষায় লাইসেন্সের আবেদন করতে পারে। প্রয়োজনীয় নথি:
- ট্রেড লাইসেন্স ও ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট।
- আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ ও বার্ষিক টার্নওভারের হিসাব।
- জিএসটি (GST) রিটার্ন ও ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন (ITR)।
৩. খেলাধুলো বা টার্গেট প্র্যাকটিস (Sports Shooting):
স্পোর্টস ক্যাটাগরিতে কেবল সক্রিয় অ্যাথলেটরাই লাইসেন্স পান। প্রয়োজনীয় নথি ও শর্ত:
- স্বীকৃত রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন বা শুটিং ক্লাবের সক্রিয় সদস্যপদ।
- NRAI (ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া) বা রাজ্য অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বারশিপ সার্টিফিকেট।
- স্পোর্টস শুটার আইডেন্টিটি কার্ড।
- বিগত ২ বছর ধরে জেলা, রাজ্য বা জাতীয় স্তরের শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের প্রমাণ।
লাইসেন্স পেলেই কি সব ধরনের বন্দুক কেনা যায়?
জেলা পুলিশের আধিকারিকদের মতে, লাইসেন্স থাকা মানেই যেকোনো আগ্নেয়াস্ত্র কেনার অনুমতি পাওয়া নয়।
- সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: যেকোনো ধরনের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান, সামরিক বাহিনী ব্যবহৃত অস্ত্র, ৩০৩ রাইফেল এবং ৭.৬২ এমএম-এর মতো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র সাধারণের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- যেগুলো কেনা যায়: বৈধ লাইসেন্স থাকলে স্মুদ বোর শটগান (একনলা SBBL বা দুইনলা DBL) কেনা যায়। বিশেষ কঠোর শর্তপূরণ সাপেক্ষে ক্ষেত্রবিশেষে ৯ এমএম পিস্তলের অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।
আবেদনের বয়স ও পদ্ধতি:
- আবেদনের বয়স: ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ২১ বছর হতে হবে। তবে স্পোর্টস শুটিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তে ১২ বছর বা তার বেশি বয়সীরাও আবেদন করতে পারেন।
- আবেদন প্রক্রিয়া: ১. জেলাশাসকের (DM) অধীনে নির্দিষ্ট আধিকারিকের কাছে অনলাইনে বা অফলাইনে Form A-1 পূরণ করে জমা দিতে হয়। ২. আবেদনটি স্থানীয় থানা ও জেলা গোয়েন্দা দপ্তরের (DIB) তদন্ত রিপোর্টের জন্য পাঠানো হয়। ৩. গোয়েন্দা ও পুলিশের সবুজসংকেত মেলার পর ফাইলটি পুনরায় জেলাশাসকের নিকট জমা পড়ে। ৪. যাবতীয় তথ্য ও রিপোর্ট খতিয়ে দেখে জেলাশাসক চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেন।
লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য ও অনলাইন আবেদনের জন্য সরকারি পোর্টাল: ndal-alis.gov.in