হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালে ঘনীভূত হচ্ছে নতুন মহাবিপর্যয়: বারুদ ঠাসা এক প্রাকৃতিক টাইমবোমা
জোশিমঠ কিংবা উত্তরকাশীই হোক বা প্রতিবেশী নেপাল— হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, প্রতিদিনের সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার চিত্র— ২০১৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত গত এক দশকে শুধু নেপালই অন্তত ১৮ বার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ভারতের উত্তরাখণ্ড, হিমাচলপ্রদেশ কিংবা সিকিমেও দুর্যোগের এই গ্রাফ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ প্রান্তে একই সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক ধ্বংসাত্মক শক্তির উৎস?
‘কাসকেডিং এফেক্ট’ ও বিপদের নতুন ভূগোল বিজ্ঞানী ও ভৌগোলিকদের মতে, তিব্বতের দক্ষিণ ঢালে দ্রুত গলছে হিমবাহ, অস্বাভাবিকভাবে বড় হচ্ছে হিমবাহ-হ্রদ এবং নরম হয়ে পড়ছে হাজার বছরের প্রাচীন চিরতুষার বা পারমাফ্রস্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই বিপর্যয়ের ধরনও বদলে গেছে। এখন আর কেবল ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’ নয়, মেঘহীন আকাশেও তিব্বতের উচ্চতা থেকে হঠাৎ কাদা, পাথর, জল আর বরফের প্রাণঘাতী স্রোত নেমে আসতে পারে। তিব্বত মালভূমিতে উৎপন্ন এই বিপর্যয় ‘কাসকেডিং এফেক্ট’-এর মতো আছড়ে পড়ছে নেপাল, ভুটান, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম এবং ডুয়ার্স অঞ্চলের বিশাল নদী অববাহিকায়।
হিমালয়: গোটা বিশ্বের জলভাণ্ডার ও তুষার-সংকট ‘ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিওলজি’-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্যতম প্রধান জলভাণ্ডার এই তিব্বত মালভূমি। এখানে ৪০ হাজারের বেশি হিমবাহ রয়েছে, যার ৭৭ শতাংশই ৫ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো এশিয়ার ১০টি প্রধান নদ-নদী এখান থেকেই উৎপন্ন। ফলে তিব্বতের পরিবেশে যে কোনও ছোট পরিবর্তন বহু দূরবর্তী সমতল জনপদেও প্রলয় ঘটাতে সক্ষম।
হিমবাহ-হ্রদের বিস্ফোরণ বা ‘গ্লফ’ (GLOF) কাঠমান্ডুর ‘আইসিমোড’ (ICIMOD)-এর বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, গত তিন দশকে তিব্বত মালভূমিতে নতুন করে প্রায় ২০০০ হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী এই হ্রদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬,৩৮৫। এই কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা ‘গ্লফ’। ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহ গলনের গতি প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি ভোটকোশি নদীতে যে বিধ্বংসী বন্যা মানুষকে গ্রাস করল, সেখানেও তিব্বত সীমান্ত থেকে হঠাৎ নেমে আসা জলস্রোতই ছিল আসল অনুঘটক।
‘ট্রান্সবর্ডার ডিজ়াস্টার জ়োন’ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তিব্বতের নিয়ালাম বা পোইকু-ভোটকোশির মতো অঞ্চলে ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া বা হিমবাহের ধসে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হওয়া নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অঞ্চলটি এখন একটি ‘ট্রান্সবর্ডার ডিজ়াস্টার জ়োন’ (সীমান্তপার বিপর্যয় অঞ্চল)। কারণ, নদী, বরফ কিংবা ধস কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত মানে না।
তিব্বতের পাহাড়ে ঘটা কোনো বিপর্যয় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতের নদী উপত্যকা কিংবা নেপাল-ভুটানে আছড়ে পড়তে পারে। তাই শুধু উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য, আবহাওয়া সঙ্কেত এবং আগাম সতর্কবার্তা সীমান্তে একে অপরের সঙ্গে কত দ্রুত শেয়ার করা যাচ্ছে—তার ওপরই নির্ভর করছে কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ জীবন ও নিরাপত্তা। پہاড়ের ওপারে জমতে থাকা বিপদ আজ আর দূরবর্তী কোনো গল্প নয়, তা আমাদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক কঠোর বাস্তবতা।