‘মাছ-মাংস খেলেই পাখণ্ডী!’ বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যে তোলপাড়, ভবানীপুর থানায় নালিশ

দুর্গাপুজোর সময় বাঙালিদের মাছ-মাংস খাওয়ার রীতি নিয়ে মন্তব্য করে চরম বিতর্কের মুখে পড়লেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। তাঁর এই বক্তব্যে বাঙালির ভাবাবেগে চরম আঘাত লেগেছে এবং দুর্গাপুজোর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে আসাম্মান করা হয়েছে— এই অভিযোগে কলকাতার ভবানীপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ প্রসাদ। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে লিলুয়ার একটি অনুষ্ঠানে এই ধরনের বক্তব্য সমাজের সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে। ফলে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে এফআইআর (FIR) ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
কী বলেছিলেন বাগেশ্বর বাবা? রবিবার হাওড়ার লিলুয়ায় এক সভায় বক্তব্য রাখার সময় ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী দুর্গাপুজো ও নবরাত্রির সময় বাঙালিদের একাংশের আমিষ খাওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। আমিষাহারী বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বা ভণ্ড বলে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন, পুজোর মণ্ডপের পেছনে মাছ-মাংস রান্না করা একটি ‘অপবিত্র’ কাজ। এমনকি কলকাতার হিন্দুদের আহ্বান জানান, উৎসবের সময় যেন এই ধরনের ব্যক্তিদের সামাজিকভাব বয়কট করা হয়।
রাজনীতি ও সংস্কৃতির পাল্টা জবাব: বাগেশ্বর বাবার এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারাও এই মন্তব্যের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার পথ বেছে নিয়েছেন।
- দিলীপ ঘোষ: তিনি স্পষ্ট জানান, দুর্গাপুজোয় বাংলায় আমিষ খাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং এর সঙ্গে ধর্মীয় প্রথা যুক্ত। পাঁঠা বলির মাংস ‘প্রসাদ’ হিসেবে গ্রহণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “কে কী খাবেন, তা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। সাধু-সন্তরা স্বাস্থ্যগত কারণে নিরামিষের পক্ষে কথা বলতেই পারেন, কিন্তু বাইরের কেউ এসে বাঙালির হাজার বছরের খাদ্যসংস্কৃতি নির্ধারণ করে দিতে পারে না।” প্রসঙ্গত, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাভাবনার কথা তুলে ধরে জানান, খাদ্যরীতির ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া বাঙালির ঐতিহ্য নয়।
- শমীক ভট্টাচার্য ও অগ্নিমিত্রা পাল: রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, তাই বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা নেই। বাঙালি মাছ-মাংস খাবে— এটিই বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি। একইভাবে বিজেপির তারকা নেত্রী অগ্নিমিত্রা পালও মনে করিয়ে দেন, ভারতের একেক রাজ্যে উৎসব পালনের নিয়ম একেক রকম, তাই অন্য রাজ্যের রীতি বাংলার ওপর জোর করে চাপানো অনুচিত।
বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া: বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যালও। তিনি মনে করিয়ে দেন, বাংলাজুড়ে শক্তি উপাসনা, বিশেষত দুর্গাপুজো ও কালীপুজোয় দেবীর উদ্দেশ্যে মাংস নিবেদনের প্রথা বহু প্রাচীন।
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ উগরে উঠেছে। বাঙালির বহুত্ববাদী খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মীয় উৎসবের মেলবন্ধনকে খাটো করার চেষ্টা করায় বাইরের কোনো ব্যক্তির এমন একপেশে নির্দেশ মানতে নারাজ বাংলা। একদিকে যেমন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের মাটি ও সংস্কৃতি রক্ষায় একসুরে সরব হয়েছে সমগ্র রাজ্য।