পাকিস্তানে পেট্রোল ৪০০ ছুঁইছুঁই! দেশটা কি সত্যিই দেউলিয়া? জানুন আসল খবর

পাকিস্তানে এক লিটার পেট্রোল কেনা এখন আমজনতার কাছে স্রেফ বিলাসিতা। পেট্রোলের দাম ৪০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেশ জুড়ে চরম আতঙ্ক ও জল্পনা তৈরি হয়েছে—তবে কি পাকিস্তান সরকারিভাবে দেউলিয়া হয়ে গেল? খাতায়-কলমে দেশটা এখনও দেউলিয়া না হলেও, অর্থনীতি যে একবারে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বর্তমানে পাকিস্তানে এক লিটার পেট্রোলের দাম ৩৮৯.১৪ টাকা থেকে ৩৯৩.৭৫ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। অন্যদিকে, হাইস্পিড ডিজেলের দাম একলাফে ৪২২ টাকা পার করে গেছে।
হঠাৎ কেন এত বাড়ল তেলের দাম?
- আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। পাকিস্তান আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর সরাসরি কোপ পড়েছে সে দেশের বাজারে।
- ডলার সংকট: আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলারে তেল কিনতে হলেও, দেশের ভেতরে তা বিক্রি হয় পাকিস্তানি টাকায়। তেলের দাম বাড়ায় আরও বেশি ডলার প্রয়োজন হচ্ছে, যা দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে বড় ধস নামিয়েছে।
- ভারী ট্যাক্স ও লেভি: আন্তর্জাতিক চড়া দামের সঙ্গেই পাকিস্তান সরকার প্রতি লিটার পেট্রোলে প্রায় ১১৪ টাকা ট্যাক্স এবং পেট্রোলিয়াম ডেভেলপমেন্ট লেভি চাপিয়েছে।
- ঋণের পাহাড়: ২০২৫ সালের জুন মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাকিস্তানের ঘাড়ের ওপর রয়েছে প্রায় ৮০.৫২ ট্রিলিয়ন টাকার বিশাল সরকারি ঋণ, যা তাদের মোট জিডিপির ৭০.৭ শতাংশ।
- আইএমএফ-এর কড়া শর্ত: পাকিস্তান বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ৭ বিলিয়ন ডলারের বেইলআউট প্রোগ্রামের ওপর নির্ভর করে চলছে। আইএমএফ-এর দেওয়া শর্ত মানতে গিয়ে সরকার জ্বালানির ভর্তুকি তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে।
পাকিস্তান কি সত্যিই ‘দেউলিয়া’?
কারিগরি দিক থেকে বলতে গেলে—না। কোনো দেশ যখন বিদেশি ঋণ মেটাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তখন তাকে ‘সভরেন ডিফল্ট’ বা দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান এখনও পর্যন্ত সেই চরম অবস্থায় পৌঁছায়নি।
আইএমএফ-এর পাশাপাশি চীন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া আর্থিক সহায়তা ও ঋণ পুনর্গঠনের ওপর ভর করে পাকিস্তান কোনোমতে টিকে আছে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাকিস্তানের হাতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৩.৭২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশীক মুদ্রার ভাণ্ডার রয়েছে। তাই পাকিস্তান পুরোপুরি দেউলিয়া না হলেও বিপদ কাটেনি।
আমজনতার ওপর আকাশছোঁয়া প্রভাব
- পরিবহন খরচ বৃদ্ধি: পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস, অটো ও পণ্যবাহী গাড়ির ভাড়া হু হু করে বেড়েছে।
- নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আগুন: পরিবহন খরচ বাড়ায় চাল, ডাল, শাকসবজি থেকে শুরু করে সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আমজনতার নাগালের বাইরে চলে গেছে।
- নামমাত্র ভর্তুকি: বাইক ও অটোর জন্য সরকার লিটার প্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত সাময়িক ভর্তুকি দিলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।
বিশাল ঋণের বোঝা, ডলারের অভাব ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন চরম সংকটে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দ্রুত কর আদায় বাড়িয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কার না আনলে আগামী দিনে দেশকে আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে হবে।