‘কর্ণাটক কর্মভূমি, ভারত ধর্মভূমি’: দাদাসাহেব ফালকে সম্মানে ভূষিত অনন্ত নাগ, মঞ্চে আবেগে ভাসলেন বর্ষীয়ান তারকা

ভারতীয় চলচ্চিত্রে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা অনন্ত নাগ। গুজরাটের কেভাদিয়ায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অনন্ত নাগের দীর্ঘ অভিনয় জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো নিয়ে একটি বিশেষ ভিজ্যুয়াল ট্রিবিউট প্রদর্শন করা হয়। তিনি যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান, তখন অডিটোরিয়ামে উপস্থিত মামুট্টি, ধনুশ, সঞ্জয় মিশ্র, ইয়ামি গৌতম, কার্তিক আরিয়ান এবং আদিত্য ধরের মতো বিশিষ্ট তারকারা দাঁড়িয়ে তাঁকে করতালি দিয়ে সম্মান জানান।
‘কর্ণাটক কর্মভূমি, ভারত ধর্মভূমি’
সম্মান গ্রহণের পর নিজের পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনের স্মৃতিচারণ করে আবেগে ভেসে যান ৭৭ বছর বয়সী এই অভিনেতা। তিনি বলেন, “এই মহান দেশ আমার জন্মভূমি, কর্ণাটক আমার কর্মভূমি আর ভারত আমার ধর্মভূমি। এত বড় একটি অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য আমি এখনও হজম করার চেষ্টা করছি।”
নিজের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে অনন্ত নাগ জানান, মাত্র ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি একটি আশ্রমে মানুষ হয়েছেন। সেখান থেকে মুম্বইয়ে গিয়ে থিয়েটারে যুক্ত হন। থিয়েটারে কাজ করাই ছিল তাঁর অভিনয়ের ‘প্রশিক্ষণ শিবির’। টানা পাঁচ বছরে প্রায় ৫০টি নাটকে অভিনয় করার পর তিনি কন্নড় ও হিন্দি সিনেমায় পা রাখেন।
তিনি আরও বলেন, “এই পুরস্কার শুধু আমার একার নয়। গত ৫০-৫৫ বছর ধরে যেসব পরিচালক, প্রযোজক, মেকআপ আর্টিস্ট, কস্টিউম ডিজাইনার, চিত্রনাট্যকার এবং টেকনিশিয়ানরা আমার সঙ্গে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, এই সম্মান তাঁদের সবার। আর অবশ্যই সেই লক্ষ লক্ষ দর্শকের, যাঁরা সাড়ে পাঁচ দশক ধরে আমাকে ভালোবেসেছেন।”
অনন্ত নাগের বর্ণময় জীবন ও কেরিয়ার
১৯৪৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কর্ণাটকে জন্মগ্রহণ করেন অনন্ত নাগ। ১৯৭৩ সালে কন্নড় ছবি ‘সংকল্প’ দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হলেও, শ্যাম বেনেগালের ‘অঙ্কুর’ ছবির মাধ্যমে তিনি হিন্দি সিনেমায় ডেবিউ করেন। এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
- বহুমুখী অভিনয়: কন্নড়, হিন্দি, তেলুগু, তামিল, মালয়ালম এবং মারাঠি ভাষায় ৩০০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। ‘মালগুড়ি ডেজ’-এর মতো কালজয়ী ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে।
- পুরস্কার ও সম্মাননা: তিনি ৫টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ৫টি কর্ণাটক রাজ্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার এবং কর্ণাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানজনক ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে।
- রাজনীতির ময়দানে: সিনেমার পাশাপাশি তিনি রাজনীতির রূপরেখাতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত কর্ণাটক বিধানসভার সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৯১৩ সালে ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ফিচার ফিল্ম ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ নির্মাণ করেছিলেন দাদাসাহেব ফালকে। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর এই যুগান্তকারী অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৬৯ সাল থেকে ভারত সরকার এই সম্মাননা চালু করে। প্রথমবার এই পুরস্কার পেয়েছিলেন দেবিকা রানি। সিনেমা জগতের এই সর্বোচ্চ সম্মান প্রাপ্ত ব্যক্তিরা একটি স্বর্ণকমল পদক, একটি শাল এবং ১০ লক্ষ টাকা নগদ অর্থ পেয়ে থাকেন।