‘আমি বাড়ি ফিরতে চাই…’ সোমালিয়ায় সেনা-জলদস্যু সংঘাতের মাঝে প্রাণ গেল একবালপুরের তনভীরের

‘আমি বাড়ি ফিরতে চাই…’ সোমালিয়ায় সেনা-জলদস্যু সংঘাতের মাঝে প্রাণ গেল একবালপুরের তনভীরের

সুদূর সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের কবলে পড়ে মর্মান্তিক পরিণতি হলো কলকাতার এক যুবকের। জিম্মি দশা থেকে মুক্ত করতে সোমালি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় দু’পক্ষের তুমুল গুলির লড়াইয়ে প্রাণ হারালেন কলকাতার একবালপুরের নবাব আলি লেনের বাসিন্দা তনভীর-উজ-জামান (৩৮)। তিনি একটি বিদেশি পণ্যবাহী জাহাজে রাঁধুনি (কুক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বছর খানেক আগেই বিয়ে হয়েছিল তনভীরের। সংসারের হাল ধরতে ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে মাত্র ছয় মাস আগে জাহাজের কুক হিসেবে পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর সোমালিয়ায়। কিন্তু সেই পথচলাই যে জীবনের শেষ সফর হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি একবালপুরের একচিলতে টালির ঘরে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা।

ঠিক কী ঘটেছিল?

গেল ২১ এপ্রিল পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র পালাউ-এর পতাকাবাহী ‘এমটি অনার ২৫’ (MT Honor 25) নামক অয়েল ট্যাঙ্কারটি প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার ব্যারেল তেল নিয়ে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর দিকে রওনা দেয়। কিন্তু মাঝপথেই জাহাজটিকে ছিনতাই করে সোমালি জলদস্যুরা।

জাহাজটিতে তনভীর ছাড়া আরও ১৬ জন নাবিক ও কর্মী ছিলেন— যার মধ্যে ১০ জন পাকিস্তানি, ৪ জন ইন্দোনেশিয়ান এবং শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের ১ জন করে নাগরিক। গত মঙ্গলবার সোমালিয়ার পান্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্স (PMPF) জলদস্যুদের কবল থেকে জাহাজটিকে মুক্ত করতে অভিযান চালায়। শুরু হয় তীব্র গুলিযুদ্ধ। সেই সংঘর্ষ চলাকালীনই বন্দুকবাজদের গুলিতে নিহত হন তনভীরসহ ৫ জন (১ জন ভারতীয়, ৩ জন পাকিস্তানি ও ১ জন মিয়ানমারের নাগরিক)।

পচা জল, অমানুষিক নির্যাতন ও ৭০ মিলিয়ন ডলারের দাবি

অপহৃত হওয়ার পর থেকে জলদস্যুরা মাঝেমধ্যে ক্যাপ্টেনের ফোন থেকে আটক নাবিকদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিত। প্রতিবারই ফোনে কান্নাভেজা গলায় দিদি রেশমাকে তনভীর বলতেন, “আমি বাড়ি ফিরতে চাই। ফিরব তো?”

তনভীরের ভাগ্নে রাজা আলতাজ় জানান, জলদস্যুরা বন্দিদের ছাড়ার বদলে ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছিল। জিম্মিদের দেওয়া হতো সামান্য খাবার আর পচা জল, সঙ্গে চলত অমানুষিক নির্যাতন। মঙ্গলবার ক্যাপ্টেনের ফোন থেকেই প্রথম তনভীরের মৃত্যুর খবর পান তাঁরা। পরে অন্য এক পাকিস্তানি ক্রু-র পাঠানো ছবি ও ভিডিও দেখে তনভীরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ আর্তি

তনভীরের বাবা মহম্মদ নূর-উজ-জামান (৭৫) নিজেও ১৯ বছর বয়স থেকে জাহাজে কাজ করেছেন। তিনি ও তনভীরের মা আটোভাঙ্গা হৃদয়ে এখন শুধু ছেলের ফেরার অপেক্ষায়। পরিবারের অভিযোগ, গত ৪ মাস ধরে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি ও ইমেল পাঠিয়েও কোনো সাহায্য মেলেনি। যে সোমালি সংস্থা ‘ওয়ার্ড মেরিটাইম এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড’-এর অধীনে তনভীর কর্মরত ছিলেন, তারা উদ্ধার প্রক্রিয়া না চালিয়ে খবরটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

বর্তমানে জলদস্যু দমন অভিযানে ট্যাঙ্কারটিকে উদ্ধার করে বোসাসো বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে শোকে পাথর পরিবারের এখন একটাই করুণ আকুতি— সরকারি সহায়তায় তনভীরের মরদেহ যেন দ্রুত কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *