মহাভারতের পাশা খেলা আজও জীবন্ত বীরভূমের গ্রামে! বাজিতে রাখা হয় কী?
মহাভারতের পাতা উল্টালেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শকুনির চক্রান্ত এবং কৌরব-পাণ্ডবদের সেই ঐতিহাসিক পাশা খেলা। যে খেলার পরিণতিতে কুরুক্ষেত্রের বুকে রচিত হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। কালের নিয়মে রাজ-অন্তঃপুরের সেই ঐতিহ্যবাহী পাশা খেলা প্রায় হারিয়ে যেতে বসলেও, বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তা আজও সমানভাবে জীবন্ত।
বীরভূমের সিউড়ি-২ ব্লকের মাজিগ্রামে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই জমে ওঠে পাশার ঠেক। গ্রামের মধ্যবয়সী ও প্রবীণ পুরুষেরা সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে হাজির হন স্থানীয় অন্নপূর্ণা মন্দির প্রাঙ্গণে। রাত ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত একটানা চলে এই প্রাচীন খেলার আসর।
হাতির দাঁতের ডাইস ও সেলাই করা কাপড়ের বোর্ড
মাজিগ্রামের এই পাশা খেলার সরঞ্জামগুলোতেও রয়েছে প্রাচীনত্বের ছোঁয়া। খেলায় ব্যবহৃত বোর্ডটি কাপড়ের তৈরি। পুরোনো হওয়ার কারণে বিভিন্ন জায়গা ছিঁড়ে গেলেও, তা সেলাই করেই সযত্নে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। চাল দেওয়ার জন্য রয়েছে কাঠের ঘুঁটি এবং হাতির দাঁতের তৈরি ঐতিহাসিক তিনটি ডাইস।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রশান্ত ঘোষ জানান, “আমাদের বাবা-দাদুরা এই খেলা খেলতেন। ছোটবেলায় তাঁদের থেকেই নিয়ম শিখেছি। মাঝে বোর্ডটি হারিয়ে গিয়েছিল। তবে ৬-৭ মাস আগে এটি আবার খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই নিয়ম করে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই আসর বসছে।”
বাজিতে কী রাখা হয়?
মহাভারতে পাশা খেলায় রাজ্য থেকে শুরু করে নিজের সর্বস্ব বাজি রাখা হয়েছিল। তবে মাজিগ্রামের এই আসরে বাজিতে রাখা হয় না কোনো অর্থ বা সম্পত্তি!
গ্রামের অপর বাসিন্দা রথীনকুমার ঘোষের স্পষ্ট কথা, “মহাভারতে পাশা খেলার জন্য যুদ্ধ হয়েছিল। আমাদের খেলায় জেতা-হারা নিয়ে তর্কাতর্কি বা সাময়িক ‘যুদ্ধ’ হলেও খেলা শেষে সব মিটে যায়। কারণ আমাদের এখানে কোনো ‘শকুনি মামা’ নেই, নেই তার চক্রান্তের চাল। হার-জিতে কোনো দেনা-পাওনা নেই, এটি নিছকই আনন্দ ও আড্ডার মাধ্যম।”
ইতিহাস ও লুডোর আদি রূপ
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন বেদ ও বৌদ্ধ সাহিত্যেও পাশা খেলার উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে মুঘল দরবার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলেও এই খেলার প্রচলন ছিল। ব্রিটিশ আমলে খেলার নিয়ম অনেকটা সহজ হয়ে আসে, যা কালক্রমে আজকের ‘লুডো’ খেলায় রূপ নিয়েছে।
বিশ্বভারতীর জনসংযোগ আধিকারিক ও ইতিহাসের অধ্যাপক অতীক ঘোষের মতে, “এত পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা বাংলায় আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।” অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাস অধ্যাপক অমিও ঘোষ জানান, “ডাইসগুলো যদি সত্যিই হাতির দাঁতের হয়, তবে এটি ভারতের স্বাধীনতার আগের কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের স্মৃতি হতে পারে।”
মনোবিদদের মতামত
আজকের ডিজিটাল যুগে যখন তরুণ প্রজন্ম মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি, তখন এই মুখোমুখি বসে খেলার অভ্যাসের প্রশংসা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য ও মনোবিদ মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অর্থের লেনদেন না থাকলে এমন খেলা মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক মেলবন্ধনের জন্য দারুণ ইতিবাচক। মোবাইল আসক্তির বিপরীতে গিয়ে প্রবীণদের এই মেলামেশা ও সামাজিক যোগাযোগ (Socialization) পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করে তোলে।