‘নির্বাচন সংস্থাকে চোর-পুতুল বলা বন্ধ করুন!’ সংস্থাকে রক্ষায় সোচ্চার প্রবীণ বিচারকরা, বিস্ফোরক খোলা চিঠি

রাজধানীর বুকে যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বিরোধী দলগুলির আন্দোলনে তোলপাড়, ঠিক সেই আবহেই দেশের সাংবিধানিক সংস্থা ও আইনি ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষায় সুর চড়ালেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং প্রাক্তন শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকরা। দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কালিমালিপ্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে দেশবাসীর উদ্দেশে একটি যৌথ খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন তাঁরা।
“নীরব থাকা এখন আর নিরপেক্ষতা নয়”
দেশবাসীর উদ্দেশে লেখা ওই চিঠিতে প্রাক্তন বিচারকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন না। তবে ভারতের সাংবিধানিক সংস্থাগুলির ওপর যেভাবে পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হচ্ছে, তাতে এখন নীরব থাকাকে আর নিরপেক্ষতা বলা যায় না। তাঁদের মতে, আজ নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগ—উভয় সংস্থাই অবমাননার শিকার।
চিঠিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, গণতান্ত্রিক অধিকারের দোহাই দিয়ে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের প্রকাশ্যে ‘চোর’ বা ‘পুতুল’ বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতা বদল হলে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে, যার নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রবীণ বিচারকরা।
প্রেস কনফারেন্স ছেড়ে আদালতে প্রমাণের চ্যালেঞ্জ
ভোটে কারচুপি বা ভোট চুরির অভিযোগ তুলে সরব হওয়া বিরোধী দলগুলিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে চিঠির স্বাক্ষরকারীরা। তাঁদের স্পষ্ট প্রশ্ন—অভিযোগ যদি সত্যিই বাস্তব হয়, তবে কেবল সাংবাদিক সম্মেলনে শোরগোল না তুলে কেন আদালতের দরজায় হলফনামা পেশ করা হচ্ছে না? কমিশন যখন শপথনামা পেশের আহ্বান জানায়, তখন বিরোধীরা কেন পিছু হটে?
ইভিএম (EVM) নিয়ে বিরোধীদের দ্বিমুখী আচরণের তীব্র সমালোচনা করে বিচারকদের পর্যবেক্ষণ—একই মেশিনে জয়ী হলে কোনও প্রশ্ন থাকে না, কিন্তু হারের মুখ দেখলেই ইভিএম-এর ঘাড়ে দোষ চাপানো এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) বিতর্কের কড়া জবাব
সম্প্রতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (SIR) নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ককে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ বিচারকরা স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ধারা ২১(৩) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে যে কোনও সময় ভোটার তালিকা সংশোধনের পূর্ণ আইনি একচ্ছত্র অধিকার দেওয়া হয়েছে।
আজ থেকে প্রায় দু’দশক আগেও যখন একই প্রক্রিয়ায় কাজ হয়েছিল, তখন কেউ একে ‘ষড়যন্ত্র’ বলেনি। এই নিয়ম ১৯৫০ সাল থেকেই বহাল, নতুন করে লেখা হয়নি। ফলে হঠাৎ করে এই প্রক্রিয়া নিয়ে জলঘোলা করার প্রচেষ্টাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই দেখছেন তাঁরা।
দেশবাসী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতি জরুরি বার্তা
গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত রাখতে চিঠিতে ৪টি মূল বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে:
- আদালতের পথ উন্মুক্ত: ভিত্তিহীন প্রমাণের ওপর নির্ভর না করে অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইনি নথিসহ কমিশন ও আদালতের কাছে যাওয়া উচিত।
- সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব: চটকদার শিরোনাম মানেই তা সত্য নয়। তথ্য যাচাই না করে জল্পনা-কল্পনাকে সংবাদে বড় করে দেখানো বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
- কমিশনের নিরপেক্ষতা: রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
- সচেতন ভোটার: সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়ো ও বিভ্রান্তিকর প্রচারে পা না দিয়ে নিজস্ব ভোটাধিকারের প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।