মহালয়ার ভোরে গঙ্গার ঘাটে কড়া নিরাপত্তা! পুণ্যার্থীদের নিশ্চিন্তে তর্পণে নবান্নের মেগা প্ল্যান

মহালয়ার ভোরে গঙ্গার ঘাটে কড়া নিরাপত্তা! পুণ্যার্থীদের নিশ্চিন্তে তর্পণে নবান্নের মেগা প্ল্যান

কলকাতা: পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের আবাহনে প্রস্তুত বাংলা। মহালয়ার শুভ ভোরে গঙ্গা সহ রাজ্যের বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল অর্পণ করতে ঢল নামবে লাখো পুণ্যার্থীর। সাধারণ মানুষের এই তর্পণ পর্ব যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে আগেভাগেই অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করেছে রাজ্য সরকার। নবান্নের তরফ থেকে রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে নির্দেশিকা পাঠিয়ে প্রতিটি ঘাটকে নিরাপত্তা ও পরিষেবার চাদরে মুড়ে ফেলার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তায় বিশেষ জোর ও উদ্ধারকারী দল

পুণ্যার্থীদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে প্রতিটি ঘাটের দায়িত্বে থাকছেন একজন করে নোডাল অফিসার। বিশেষ করে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভাকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনারেটের সাথে নিবিড় সমন্বয় রেখে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা: ভোর ৩টে থেকেই প্রতিটি প্রধান ঘাটে মোতায়েন থাকবে ডুবুরি, লাইফ জ্যাকেট, বয়া এবং উদ্ধারকারী সরঞ্জামসহ স্পিডবোট। বিপর্যয় মোকাবিলা, পরিবহণ, দমকল এবং পুলিশ দপ্তর যৌথভাবে মোতায়েন থাকবে।
  • নিরাপদ জলসীমা: বিপজ্জনক গভীর জলে প্রবেশ রুখতে ভাসমান ব্যারিকেড ও দড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট ‘সেফ জোন’ তৈরি করা হয়েছে।
  • স্পেশাল ফোর্স: কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলিতে রাজ্য ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF ও NDRF) সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে।
  • সতর্কতামূলক প্রচার: ঘাটের পিছল সিঁড়ি সংস্কারের পাশাপাশি মাইকিং ও সাইনবোর্ডের মাধ্যমে পুণ্যার্থীদের প্রতিনিয়ত সতর্ক করা হবে।

মহিলাদের সুরক্ষা ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য

তর্পণ পর্বের সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

  • স্বচ্ছতা ও ব্যক্তিগত সুবিধা: প্রতিটি বড় ঘাটে পর্যাপ্ত আলো ও জলের ব্যবস্থাসহ মহিলাদের পোশাক পরিবর্তনের জন্য আলাদা কক্ষ এবং বায়ো-টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেখানে পাহারায় থাকবেন মহিলা পুলিশ কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবিকারা।
  • একমুখী পথ ও যান নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে ঘাটগুলিতে প্রবেশ ও বেরোনোর জন্য ব্যারিকেড দিয়ে একমুখী পথ তৈরি করা হয়েছে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মোতায়েন থাকছে পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী।

পরিচ্ছন্নতা, আলো ও জরুরি চিকিৎসা

নিরাপত্তার পাশাপাশি ঘাটগুলির পরিচ্ছন্নতায় সমান নজর দেওয়া হচ্ছে। জমে থাকা কাদা, আবর্জনা, ফুল ও কচুরিপানা পরিষ্কার করে ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক ছড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তর্পণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাফাইকর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে শিফটে কাজ করবেন।

  • বিদ্যুৎ ও পানীয় জল: সিইএসসি ও রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ ভোর ৩টে থেকে পর্যাপ্ত আলোর বন্দোবস্ত করছে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর ও পুরসভার পক্ষ থেকে অস্থায়ী কিয়স্ক ও জলের ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করা হবে।
  • চিকিৎসা সেবা: যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘাটগুলিতে প্রস্তুত থাকবে ফার্স্ট-aid ক্যাম্প এবং অ্যাম্বুল্যান্স। নিকটবর্তী হাসপাতালগুলিকেও বিশেষ সতর্কবার্তায় রাখা হয়েছে।

কন্ট্রোল রুম ও শীর্ষ নজরদারি

পুরো প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে, তার জন্য জেলাশাসক ও কলকাতা পুরসভার কমিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যসচিব। জেলাগুলির পাশাপাশি নবান্নের ‘স্টেট এমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’-এ বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু থাকছে, যা তর্পণ পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে। সবমিলিয়ে, পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনায় রাজ্যবাসীর তর্পণ পর্ব নির্বিঘ্ন রাখতে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছে প্রশাসন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *