থানায় কালীপুজো নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

থানায় কালীপুজো নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

থানায় কালীপুজো: ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক

রাজ্যের থানাগুলিতে কালীপুজোর আয়োজন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। মন্ত্রী দাবি করেছেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে প্রশাসনিক স্তরে এই পুজোর ওপর বাধা এসেছিল। মন্ত্রী মনে করেন, পুলিশি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রতিটি থানায় দেবী কালীর আরাধনা হওয়া উচিত, যা অপরাধ দমনে ও পুলিশকর্মীদের মানসিকতায় এক বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পুলিশি সংস্কৃতি

বাংলার ইতিহাসে থানার কালীপুজোর শেকড় বেশ গভীর। ব্রিটিশ শাসনামলে বর্ণবাদী মানসিকতা ও শ্বেতাঙ্গ কর্তাদের অবহেলার প্রতিবাদস্বরূপ ভারতীয় পুলিশ কর্মীরা নিজেদের আত্মপরিচয় ও সাহসের প্রতীক হিসেবে থানার ভেতরে কালীপুজো শুরু করেন। এছাড়া, ডাকাতদের শক্তি আরাধনার লোকবিশ্বাসকেও এর পেছনে এক কারণ হিসেবে দেখা হয়। গঙ্গারামপুর বা চাঁচলের মতো বেশ কিছু থানায় ব্রিটিশ আমল থেকেই তান্ত্রিক মতে পুজোর প্রচলন রয়েছে, যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পুলিশকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। প্রশাসনিক স্তরে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশিকা না থাকলেও, এটি দীর্ঘদিনের এক বিশেষ পুলিশি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

প্রভাব ও রাজনৈতিক সংঘাত

থানায় কালীপুজোর ধর্মীয়করণের বিষয়টি সংবিধানবিরোধিতা বলে বিরোধী দলগুলো সরব হলেও, স্থানীয় স্তরে এই পুজোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজিরও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মুসলিম ওসি কিংবা অহিন্দু পুলিশ কর্মীরা এই আয়োজনে সক্রিয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুজোকে ঘিরে রক্তদান শিবির বা বস্ত্র বিতরণের মতো সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি পালনের ফলে এটি পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মেলবন্ধনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে মন্ত্রীর এই আহ্বানকে কেন্দ্র করে রাজ্যের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো নিয়ে পুনরায় বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে।

এক ঝলকে

  • ঐতিহাসিক ভিত্তি: ব্রিটিশ আমল থেকে ভারতীয় পুলিশ কর্মীদের আত্মপরিচয় রক্ষার তাগিদ ও লোকবিশ্বাসের হাত ধরে বাংলার থানাগুলিতে কালীপুজোর সূচনা।
  • বিবাদের কেন্দ্রে: মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্যে প্রশাসনিক স্তরে এই পুজোকে উৎসাহ দেওয়ার দাবি ওঠায় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
  • অসাম্প্রদায়িক রূপ: বহু থানায় ধর্ম নির্বিশেষে পুলিশকর্মীদের অংশগ্রহণে এই পুজো দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
  • সামাজিক উদ্যোগ: পুজোকে উপলক্ষ করে থানায় থানায় রক্তদান ও বস্ত্র বিতরণের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডও নিয়মিত পরিচালিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *