ল্যাবে হাত না ধোয়ার ভুল! এভাবেই কি তৈরি হলো জনপ্রিয় কৃত্রিম চিনি ‘স্যাকারিন’?

ল্যাবে হাত না ধোয়ার ভুল! এভাবেই কি তৈরি হলো জনপ্রিয় কৃত্রিম চিনি ‘স্যাকারিন’?

বর্তমান সময়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ে দুশ্চিন্তা ঘরে ঘরে। তার ওপর বাজারে চিনির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে অনেকেই এখন বিকল্প হিসেবে ‘সুগার-ফ্রি’ বা ‘স্যাকারিন’ বেছে নেন। তবে আপনি কি জানেন, চিনির এই জনপ্রিয় বিকল্পটি কিন্তু কোনো পরিকল্পিত গবেষণার ফসল নয়? বিজ্ঞানীর এক ছোটখাটো ভুল ও অসাবধানতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল স্যাকারিন।

খাবারের টেবিলে অপ্রত্যাশিত মিষ্টি স্বাদ ১৮৭৯ সালের ঘটনা। আমেরিকার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কোল টার’ (Coal tar) নিয়ে গবেষণা করছিলেন বিজ্ঞানী কনস্ট্যান্টিন ফাহলবার্গ। কাজ শেষ করে তিনি হাত না ধুয়েই সোজা খেতে বসে পড়েছিলেন। খাবার মুখে দিতেই এক অদ্ভুত তীব্র মিষ্টি স্বাদ পান তিনি। প্রথমে ভেবেছিলেন খাবারের কোনো সমস্যা, কিন্তু শীঘ্রই উপলব্ধি করেন যে মিষ্টি স্বাদটি তাঁর হাতে লেগে থাকা রাসায়নিক থেকেই আসছে।

ল্যাবে প্রত্যাবর্তন ও ‘বেনজোয়িক সালফিমাইড’ খাবার ফেলে রেখে তিনি তখনই ল্যাবে ফিরে যান এবং একের পর এক রাসায়নিক পাত্র পরীক্ষা করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হদিশ পান এক বিশেষ রাসায়নিক যৌগের—‘বেনজোয়িক সালফিমাইড’। সাধারণ চিনির তুলনায় এটি বহুগুণ বেশি মিষ্টি! রসায়নবিদ ইরা রেমসেন এবং ফাহলবার্গের যৌথ প্রচেষ্টায় এই রাসায়নিক যৌগটিই পরবর্তীতে ‘স্যাকারিন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

বাণিজ্যিক উৎপাদন ও খাদ্য শিল্পে নতুন দিগন্ত এই আকস্মিক আবিষ্কারের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বুঝতে গবেষকদের বেশি সময় লাগেনি। এর পরিকাঠামো গড়ে তুলে জার্মানিতে প্রথম স্যাকারিনের কারখানা স্থাপন করা হয়। ক্যালোরি ছাড়া মিষ্টি স্বাদের যোগান দিয়ে স্যাকারিন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে খাদ্য প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর কাছে বিকল্প মিষ্টি ব্যবহারের নতুন দরজা খুলে যায় এবং অন্যান্য কৃত্রিম সুইটনার তৈরির পথও সুগম হয়।

বিতর্ক ও আধুনিক গুরুত্ব রাসায়নাগারে তৈরি রাসায়নিক মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বিংশ শতাব্দীতে বহু বিতর্ক ও দীর্ঘ তরজা চলেছে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা কাটতে সময় লাগলেও স্যাকারিন তার গুরুত্ব হারায়নি। আজ আবিষ্কারের প্রায় দেড়শো বছর পরেও খাদ্য সামগ্রীর পাশাপাশি আধুনিক ওষুধ শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্যাকারিনের ব্যবহার সমানভাবে বজায় রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *