‘এক ইঞ্চি জমিও ছাড়া হবে না’, মমতার ভোকাল টনিক, মুখ খোলার বিষয়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা

রাজ্যে ক্ষমতার ঐতিহাসিক পালাবদলের পর দল যখন এক চরম কঠিন ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দলের প্রথম সারির জনপ্রতিনিধিদের মনোবল চাঙ্গা করতে সরাসরি আসরে নামলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মে মাসে সরকার হাতছাড়া হলেও, রাজ্যের গ্রামীণ ক্ষমতার অলিন্দ অর্থাৎ জেলা পরিষদগুলি এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের দখলেই রয়েছে। এই ব্যাকগ্রাউন্ডকে হাতিয়ার করেই রবিবার কালীঘাটের বাসভবনে রাজ্যের সমস্ত জেলা পরিষদের তৃণমূল সদস্যদের নিয়ে এক হাই-প্রোফাইল আপৎকালীন বৈঠক করলেন দলনেত্রী। বৈঠক থেকে স্পষ্ট ভাষায় তিনি বার্তা দিয়েছেন—ক্ষমতা গেলেও মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে, কোনো অবস্থাতেই ভেঙে পড়া চলবে না।
গ্রামীণ দুর্গ ধরে রাখতে মরিয়া কালীঘাট
বৈঠকে জেলা পরিষদের সভাধিপতি, সহ-সভাধিপতি এবং সদস্যদের উদ্দেশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেন যে, পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ স্তরের উন্নয়নমূলক কাজের রাশ যেন কোনোভাবেই আলগা না হয়। নতুন বিজেপি সরকার যাতে অনৈতিকভাবে বা দলবদল করিয়ে জেলা পরিষদগুলি দখল করতে না পারে, তার জন্য আইনি ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি। কর্মীদের উদ্দেশ্যে দলনেত্রীর কড়া বার্তা:
“রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছি মানেই সব শেষ হয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে জেলা পরিষদগুলিতে জিতিয়েছেন। মানুষের দেওয়া সেই আমানত আমাদের রক্ষা করতে হবে। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন না। এখান থেকেই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন লড়াই এবং প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।”
দলীয় কোন্দল ও একে অপরের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা
ভোটের এই বিপর্যয় বা ভরাডুবির পর দলের অন্দরে যে অন্তর্কলহ এবং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর খেলা শুরু হয়েছে, তা নিয়ে রবিবার অত্যন্ত রূঢ় ও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠক সূত্রে খবর, দলের কিছু নেতার সংবাদমাধ্যম বা সমাজমাধ্যমে দেওয়া আলটপকা বয়ান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে:
- সংবাদমাধ্যমে ফিসফাস বন্ধ: দলের কোনো স্তরের নেতা বা জনপ্রতিনিধি এই মুহূর্তে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বা হারের কারণ নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো মুখ খুলতে পারবেন না।
- শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তি: দলের কেউ যদি অন্য কোনো সহকর্মীর বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করেন বা সংবাদমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দেন, তবে দল তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রকম কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause) না দিয়েই সরাসরি বহিষ্কারের মতো চরম অনুশাসনমূলক পদক্ষেপ নেবে।
- একজোট থাকার নির্দেশ: এই কঠিন সময়ে দলের অন্দরে একতা বজায় রাখাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। সমস্ত ক্ষোভ-বিক্ষোভ দলের অভ্যন্তরীণ ফোরামেই জানাতে হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় নতুন সরকারের হানিমুন পিরিয়ড চলাকালীনই তৃণমূল সুপ্রিমো যেভাবে নিজের গ্রামীণ দুর্গ অর্থাৎ জেলা পরিষদগুলিকে আগলাতে ময়দানে নামলেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলের ভাঙন রোধ করতে এবং ২০২৬-এর এই ট্রানজিশন পিরিয়ডে কর্মীদের মাঠে টিকিয়ে রাখতেই কালীঘাটের এই মেগা ভোকাল টনিক ও কড়া শৃঙ্খলা বার্তা।