পুলিশের পোশাকেই তোলাবাজি-পাচার চক্রের ডন, যেভাবে গড়ে উঠেছিল ডি‌সি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের অপরাধের সাম্রাজ্য

পুলিশের পোশাকেই তোলাবাজি-পাচার চক্রের ডন, যেভাবে গড়ে উঠেছিল ডি‌সি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের অপরাধের সাম্রাজ্য

সাব-ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে কলকাতা পুলিশের অত্যন্ত প্রভাবশালী ডেপুটি কমিশনার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ)— প্রথম জীবনের এক সাধারণ পুলিশ অফিসারের এই উল্কাসদৃশ উত্থানের গল্প যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। কিন্তু উর্দির আড়ালে থাকা সেই ‘অসাধারণ’ সাফল্যের নেপথ্যে যে লুকিয়ে ছিল শুধুই অপরাধ, বেআইনি সিন্ডিকেট আর দুর্নীতির পাহাড়, তা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) সাম্প্রতিক গ্রেফতারে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ধৃত পুলিশকর্তা শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের অপরাধ সাম্রাজ্যের খুঁটিনাটি এবার চলে এসেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির আতশ কাঁচের তলায়।

কালীঘাট থানা থেকে উত্থান এবং মমতাকে ‘মা’ সম্বোধন

তদন্তকারী সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২০ সালের করোনা অতিমারির সময় থেকেই শান্তনুর প্রভাব প্রতিপত্তি আকাশ ছুঁতে শুরু করে। দক্ষিণ কলকাতার হাই-প্রোফাইল কালীঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (OC) বা ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তৎকালীন শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের ‘গুড বুক’-এ চলে আসেন তিনি।

  • দ্রুত প্রমোশন: তৃণমূল কংগ্রেস এবং খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে চরম ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বিভাগীয় সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক প্রমোশন বা পদোন্নতি পেতে থাকেন শান্তনু।
  • অবসরের পর এক্সটেনশন: শেষে ডেপুটি কমিশনার (DC) পদে উন্নীত হওয়ার পর চাকরি থেকে অবসর নিলেও, তাঁর প্রতি নবান্নের দাক্ষিণ্য কমেনি। অবসরের পরেও আরও দু’বছরের জন্য এক্সটেনশন (চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি) দিয়ে তাঁকে ডিরেক্টর অফ সিকিউরিটি বা স্পেশাল ব্রাঞ্চের মতো অতি সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বিভাগের প্রধান করে মুখ্যমন্ত্রীর খাস নিরাপত্তার দায়িত্বে বসানো হয়। পুলিশ ও রাজনৈতিক মহলে কান পাতলে শোনা যেত, প্রভাবের চোটে শান্তনু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন, যা নিয়ে বিরোধীরাও বারবার সরব হয়েছিলেন।

পুলিশের বদলি ও প্রোমোটিংয়ের ‘টাকার রাজা’

ইডির চার্জশিট এবং লালবাজারের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, শান্তনু সিনহা বিশ্বাস ছিলেন রাজ্যের পুলিশ মহলের অলিখিত ‘ট্রান্সফার ডন’। তিনি রাজ্য পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ আহ্বায়ক থাকার সুবাদে সারা রাজ্যের সমস্ত থানার ওসি এবং আইসি-দের (OC/IC) কার্যত নিজের রিমোট কন্ট্রোলে রাখতেন।

  • বদলির সিন্ডিকেট: রাজ্য পুলিশের আইপিএস (IPS) থেকে শুরু করে ডব্লিউবিপিএস (WBPS) স্তরের অফিসারদের পছন্দসই জায়গায় বদলি বা প্রোমোশনের জন্য শান্তনুর কাছে কোটি কোটি টাকার উপঢৌকন বা প্রণামী পাঠাতে হতো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে বদলির অফিশিয়াল অর্ডার হয়ে যাওয়ার পরেও যদি শান্তনুর কাছে নির্দিষ্ট কাটমানি না পৌঁছাত, তবে সেই বদলির অর্ডার রাতারাতি বাতিল বা স্থগিত হয়ে যেত।
  • অবৈধ কল সেন্টার ও তোলাবাজি: এর পাশাপাশি সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের একাধিক বেআইনি আন্তর্জাতিক কল সেন্টার সচল রাখা এবং কলকাতার বড় বড় প্রোমোটারদের থেকে তোলাবাজির টাকার সিংহভাগই সরাসরি শান্তনুর অ্যাকাউন্টে এবং তাঁর মাধ্যমে প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছাত বলে ইডির দাবি।

জয় কামদার ও সোনা পাপ্পুর সাথে ‘ত্রিমুখী’ ল্যান্ড সিন্ডিকেট

ইডির তদন্তে শান্তনুর অপরাধ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে দিকটি উঠে এসেছে, তা হলো জমি দখলের এক বিশাল ‘ত্রিমুখী’ সিন্ডিকেট। এই চক্রটি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করত— শান্তনু সিনহা বিশ্বাস, জয় কামদার এবং সোনা পাপ্পু।

  • কাজের ধরণ: জয় কামদারের মূল কাজ ছিল জমি দখল ও ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল ফাণ্ড বা টাকা জোগাড় করা। অন্যদিকে, কুখ্যাত সোনা পাপ্পুর কাজ ছিল নিজের গুন্ডাবাহিনী দিয়ে কলকাতার নিরীহ জমির মালিকদের ভয় দেখানো, মারধর করা ও ঘরছাড়া করা। আর এই অপরাধ চক্রের মাথার ওপর আইনি ও প্রশাসনিক রক্ষাকবচ বা ছাতা হয়ে বসে থাকতেন খোদ ডি‌সি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস।
  • থানায় ডেকে হুমকি: কোনো জমির মালিক জমি বা বাড়ি ছাড়তে না চাইলে, শান্তনুর নির্দেশে তাঁকে সরাসরি থানায় ডেকে এনে কেস দেওয়ার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক জাল চুক্তিপত্রে সই করিয়ে জলের দরে জমি লিখিয়ে নেওয়া হতো। এই সিন্ডিকেটের টাকার ভাগ পৌঁছাত স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলরদের পকেটেও। কয়লা, বালি এবং গরু পাচারের সেফ প্যাসেজ বা গ্রিন করিডোর করে দেওয়ার পেছনেও শান্তনুর পুলিশি ক্ষমতার বড় ভূমিকা ছিল।

ডায়েরি ও গ্যাজেটেই লুকিয়ে পতনের সূত্র

আইনশৃঙ্খলার রক্ষক হয়েও যেভাবে শান্তনু অপরাধীদের প্রধান আশ্রয়দাতা হয়ে উঠেছিলেন, তা নতুন সরকারের জমানায় ইডির তদন্তে সম্পূর্ণ ফাঁস হয়ে গেল। সম্প্রতি ইডির গোয়েন্দারা শান্তনুর দুই সাগরেদ জয় কামদার এবং সোনা পাপ্পুর ডায়েরি, মোবাইল ফোন এবং একাধিক ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বাজেয়াপ্ত করেন। সেই ডায়েরির পাতায় ও চ্যাট হিস্ট্রিতেই শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নাম এবং কাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, তার সমস্ত কাঁচা খতিয়ান উদ্ধার করে আদালতে পেশ করেছেন ইডির আইনজীবীরা। এই দুঁদে আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারের গ্রেফতারির পর এখন নবান্নের অলিন্দে কাঁপন ধরেছে— এই সিন্ডিকেটের শিকড় তৎকালীন সরকারের আর কোন কোন রাঘববোয়ালের দোরগোড়া পর্যন্ত বিস্তৃত, এখন সেটাই খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *