সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে আইনি মামলার চূড়ান্ত অনুমোদন নবান্নের, ‘আমি সৌভাগ্যবান’ লিখে নির্দেশিকা পোস্ট মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের আইনি জাঁতাকল আরও শক্ত করতে এক ঐতিহাসিক ও কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। আরজি করের দুর্নীতি ও অভয়া কাণ্ডের আবহে তৎকালীন বিতর্কিত সুপার তথা অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ইডি (ED) যাতে আইনি পদ্ধতি অনুযায়ী আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, তার জন্য সরকারিভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন (Sanction of Prosecution) দিল রাজ্য সরকার।
সোমবার রাতে রাজ্য সরকারের এই হাই-ভোল্টেজ সিদ্ধান্তের কথা খোদ নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে সরকারি নির্দেশিকাসহ পোস্ট করে দেশবাসীকে জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নতুন সরকারের এই পদক্ষেপের পর সন্দীপ ঘোষের দ্রুত শাস্তির সম্ভাবনা আরও জোরালো হলো।
বিগত সরকার অনৈতিকভাবে তদন্ত আটকে রেখেছিল, তোপ মুখ্যমন্ত্রীর
সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর অফিশিয়াল নির্দেশিকাটি নিজের এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লেখেন:
“আজ আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একটি মহতী ও সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। গত ৯ই আগস্ট ২০২৪ সালে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে বোন অভয়ার নৃশংস খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় তৎকালীন আরজি কর-এর সুপার কুখ্যাত সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে আইনি পদ্ধতি অনুযায়ী ইডি-কে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দোষী সাব্যস্ত করার অনুমতি প্রদান করা হলো। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকার জোরপূর্বক ও অনৈতিকভাবে এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিল। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সত্যকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না। আমি চাই, বোন অভয়ার প্রকৃত দোষীরা দ্রুত চিহ্নিত হোক, কঠোরতম শাস্তি পাক এবং বাংলার মানুষ ন্যায়বিচার প্রত্যক্ষ করুক। বোন অভয়ার আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।”
রাজ্যপালের সবুজ সংকেত, আর্থিক তছরুপের মামলায় সাঁড়াশি চাপ
নবান্ন সূত্রে জারি করা ওই সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি, বাজেয়াপ্ত হওয়া তথ্যপ্রমাণ এবং তদন্তের যাবতীয় উপাদান পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের কাছে পেশ করা হয়েছিল। রাজভবন থেকে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সেগুলি খতিয়ে দেখার পরই অভিযুক্ত প্রাক্তন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে ট্রায়াল বা মামলা চালানোর এই আইনি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, কলকাতা হাইকোর্টের ২০২৪ সালের ২৩ আগস্টের ঐতিহাসিক নির্দেশ মেনে কলকাতা পুলিশের টালা থানায় দায়ের হওয়া আর্থিক দুর্নীতির মামলার তদন্তভার হাতে নিয়েছিল সিবিআই-এর অ্যান্টি-কোরাপশন ব্রাঞ্চ। আরজি কর হাসপাতালে বিভিন্ন চিকিৎসার সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনার নামে কোটি কোটি টাকার যে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল, সিবিআই তদন্তে সন্দীপ ঘোষের পাশাপাশি আরও তিনটি বেসরকারি সংস্থার নাম জড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে সিবিআই-এর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ইডি অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন বা পিএমএলএ (PMLA) ধারায় পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির হদিস পায়।
নতুন ৪টি আইনের কড়া ধারায় আদালতে চলবে বিচার
রাজ্য সরকারের এই চূড়ান্ত অনুমোদনের ফলে এখন থেকে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS), ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), দুর্নীতি দমন আইন (Prevention of Corruption Act) এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের একাধিক অ-জামিনযোগ্য ও কঠোর ধারায় সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে আদালতে স্পেশাল ট্রায়াল চালানো সম্ভব হবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, আরজি কর কাণ্ডের পর দীর্ঘদিন ধরে ধৃত সন্দীপ ঘোষের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা নিয়ে যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল, শুভেন্দু সরকারের এই একটি মাত্র ‘স্যাংশন’ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সেই জট কেটে গেল এবং অভিযুক্তের দীর্ঘমেয়াদি জেলের রাস্তা পরিষ্কার হলো।