কে এই আইপিএস দময়ন্তী সেন? মমতা আমলে কোণঠাসা হয়েও, এখন শুভেন্দু সরকারের কাছ থেকে বড় দায়িত্ব পেলেন

পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক স্তরে রদবদলের আবহে আইপিএস (IPS) কর্মকর্তা দময়ন্তী সেন আবারও রাজ্যের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার রাজ্যের পুলিশ মহলে ‘সুপারকপ’ হিসেবে পরিচিত এই দুঁদে নারী অফিসারকে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের তদন্তের জন্য গঠিত একটি উচ্চ-স্তরের বিশেষ কমিটির ‘সদস্য সচিব’ (Member Secretary) হিসেবে নিযুক্ত করেছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, ২০১২ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ মামলা’-র প্রকৃত সত্য ও প্রমাণের খতিয়ান খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মুখের ওপর তুলে ধরার জন্য যে আইপিএস অফিসারকে এক দশক ধরে শাস্তি ও নির্বাসন ভোগ করতে হয়েছিল, ১৪ বছর পর শুভেন্দু সরকার তাঁকে সসম্মানে মূল স্রোতের বড় দায়িত্বে ফিরিয়ে এনে এক মস্ত বড় চমক দিল।
কে এই আইপিএস দময়ন্তী সেন?
দাময়ন্তী সেন হলেন ১৯৯৬ ব্যাচের একজন অত্যন্ত দক্ষ ও কড়া মেজাজের আইপিএস অফিসার। কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে ‘যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ)’ বা Joint CP (Crime) পদে অধিষ্ঠিত হওয়া প্রথম মহিলা কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। কর্মজীবনের শুরু থেকেই অত্যন্ত সততা ও সাহসিকতার সাথে বেশ কয়েকটি বহুল আলোচিত মামলার রহস্যভেদ ও তদন্তের কাজ পরিচালনা করেছেন তিনি। কিন্তু ২০১২ সালের কুখ্যাত ও সাড়া জাগানো পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ মামলার দ্রুত তদন্ত এবং মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক মতামতের তোয়াক্কা না করে সত্য উদঘাটন করার জন্যই তিনি বাংলার মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয় লাভ করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সাজানো ঘটনা’ তত্ত্ব ও দময়ন্তীর অনমনীয় জেদ
ঘটনার সূত্রপাত ২০১২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি বিখ্যাত নাইটক্লাব থেকে গভীর রাতে বাড়ি ফেরার পথে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলাকে চলন্ত গাড়ির ভেতর কয়েকজন প্রভাবশালী যুবক মিলে গণধর্ষণ করে। রাজ্যে তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার অল্প কিছুদিন পরেই ঘটা এই নৃশংস ঘটনাটি গোটা রাজ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তড়িঘড়ি সাংবাদিক বৈঠক করে এই ঘটনাটিকে তাঁর নতুন সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিরোধীদের একটি ‘সাজানো ঘটনা’ ও ‘ভুয়ো কাহিনী’ বলে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতা পুলিশের তৎকালীন ক্রাইম প্রধান দময়ন্তী সেন মুখ্যমন্ত্রীর সেই রাজনৈতিক বিবৃতি বা বাগাড়ম্বরকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন। তিনি নিজের তদন্তকারী দলকে সাথে নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণ করে দেন যে গণধর্ষণের ঘটনাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরোয়া না করেই তিনি কয়েক দিনের মধ্যে মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে শ্রীঘরে পুরেছিলেন।
সত্য প্রকাশ করার পুরস্কার: লালবাজার থেকে সোজা ‘একঘরে’ নির্বাসন
পার্ক স্ট্রিট মামলার আসল সত্য ও অপরাধীদের মুখোশ জনসমক্ষে টেনে আনার খেসারত দময়ন্তী সেনকে হাতেনাতে দিতে হয়েছিল। নবান্নের অলিন্দের ক্ষোভের মুখে পড়ে মামলাটি সমাধানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারের হাই-প্রোফাইল পদ থেকে সরিয়ে ব্যারাকপুর পুলিশ ট্রেনিং একাডেমির (PTA) অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ ও সাইড লাইনের পদে বদলি করে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তৃণমূল জমানায় তাঁকে কোনো বড় বা স্পর্শকাতর মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি এবং কার্যত ‘একঘরে’ ও কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। ২০২৬-এ বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেই ফের একবার সসম্মানে প্রত্যাবর্তন ঘটল ময়দানের এই লড়াকু অফিসারের।
নারী সুরক্ষা ও গণশুনানি কমিটির হাল ধরছেন দময়ন্তী
রাজ্যে নারীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দময়ন্তী বা সম্পতি চ্যাটার্জীর নেতৃত্বে যে বিশেষ হাই-পাওয়ার কমিটি গঠন করেছে, তার প্রশাসনিক ফ্রন্ট সামলাবেন এই আইপিএস অফিসার। আগামী ১লা জুন থেকে এই কমিটি রাজ্যের বিভিন্ন স্পর্শকাতর থানাগুলি পরিদর্শন করবে এবং সরাসরি নিচুতলার নারীদের অভিযোগের ‘গণশুনানি’ করবে। ১লা জুনের এই মেগা অভিযানের আগে দময়ন্তী সেনের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ পুলিশ দল বিগত কয়েক বছরে রাজ্যে নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সমস্ত অপরাধ ও আইনি নিষ্ক্রিয়তার সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য ও ডাটাবেস প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছে।
তৃণমূল জমানার দুর্নীতি ও কাটমানি তদন্তে আরও এক বিশেষ কমিটি
নারী নির্যাতনের পাশাপাশি বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে হওয়া সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ‘কাটমানি’ রাজের তদন্তের জন্য পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভা কলকাতা হাইকোর্টের আরও এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি পৃথক কমিটি গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার জানান, এই দুর্নীতি তদন্তকারী কমিটির প্রধান বা চেয়ারম্যান হবেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন রাজ্য পুলিশের সিনিয়র এডিজি (ADG) পদমর্যাদার আইপিএস কর্মকর্তা জয়রামন। নতুন সরকারের এই জোড়া কমিটির ব্যাক-টু-ব্যাক অ্যাকশন রাজ্যে বিগত জমানার প্রভাবশালী নেতা ও মাফিয়াদের যে ঘুম ওড়াতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।