উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বড়সড় রদবদল, শ্রীঘরে শাসকদলের দুই প্রভাবশালী নেতা!

উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বড়সড় রদবদল, শ্রীঘরে শাসকদলের দুই প্রভাবশালী নেতা!

রাজ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এতদিন যে সব দাপুটে নেতার দাপটে এলাকা থমথমে থাকত, এখন তাঁদেরই একের পর এক ঠাঁই হচ্ছে জেলহাজতে। গত কয়েকদিনে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা। একজনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হাসপাতাল চত্বরে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানোর মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে, তো অন্যজন ফেঁসেছেন লাখ লাখ টাকার চাকরি চুরির কেলেঙ্কারিতে। নতুন জমানায় পুলিশের এই ব্যাক-টু-ব্যাক অ্যাকশনে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

রায়গঞ্জে অস্ত্র মামলায় প্রাক্তন কাউন্সিলর গ্রেপ্তার

প্রথম চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে রায়গঞ্জ শহরে। অস্ত্র আইনের জালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে রায়গঞ্জ পুরসভার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলর অভিজিৎ সাহা ওরফে বাপিকে। দেবীনগর এলাকার এই বাসিন্দার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনসহ একাধিক গুরুতর এবং জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। সোমবার ধৃত বাপিকে রায়গঞ্জ মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলে বিচারক তাকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। আদালতের সরকারি আইনজীবী নীলাদ্রি সরকার এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, যখন এক পিকনিকের আসরে খুন হন তৃণমূলের যুব সহসভাপতি নব্যেন্দু ঘোষ। সেই খবর পেয়ে রায়গঞ্জ হাসপাতালে ছুটে যান ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের যুব সভাপতি প্রসেনজিৎ রায় ওরফে চ্যাপেল এবং তাঁর বন্ধুরা। অভিযোগ, ঠিক সেই সময়েই হাসপাতাল চত্বরে চড়াও হন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি রন্তু দাস, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর তপন দাসের ছেলে সানকিং দাস এবং অভিজিৎ সাহা বাপি। তাঁরা প্রকাশ্যেই পিস্তলের বাট দিয়ে মেরে চ্যাপেল ও তাঁর বন্ধুদের মাথা ফাটিয়ে গুরুতর জখম করেন। তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে ফের লিখিত অভিযোগ দায়ের হতেই পুলিশ নড়েচড়ে বসেছে। রায়গঞ্জ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার ডাঃ সোনাওয়ানে কুলদীপ সুরেশ জানিয়েছেন, ধৃত বাপির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে এবং বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি জারি রয়েছে।

দক্ষিণ দিনাজপুরে কনস্টেবল নিয়োগে কোটি টাকার দুর্নীতি

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পাশের জেলা দক্ষিণ দিনাজপুরে আছড়ে পড়েছে বড়সড় দুর্নীতির ধাক্কা। রাজ্যে সরকার বদলাতেই চাকরি চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন খোদ তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন মিয়া। পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে গঙ্গারামপুর থানায় এই বিষয়ে এক প্রতারিত চাকরিপ্রার্থী প্রথম অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।

পুলিশ এই অভিযানে শুধু মফিজ উদ্দিন মিয়াকেই নয়, হাতেনাতে ধরেছে তাঁর এক বিশ্বস্ত সহযোগীকেও। দক্ষিণ দিনাজপুরের দাপুটে নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এই মফিজ উদ্দিনের গ্রেপ্তারিতে জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ এক ধাক্কায় অনেকটাই বদলে গিয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার চিন্ময় মিত্তাল এই বিষয়ে জানিয়েছেন, চাকরি দুর্নীতির এই পুরনো মামলায় গভীর তদন্ত চালাতেই এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসে এবং তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রশাসনের এই কঠোর মনোভাবের কারণে আগামী দিনে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে এবং দুর্নীতি দমনে পুলিশের এই অতিসক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে আইনের প্রতি আস্থা বাড়াবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *