প্যাকেটের চকচকে মোড়কে ‘স্লো পয়জন’, ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে সাধারণ মানুষ

প্যাকেটের চকচকে মোড়কে ‘স্লো পয়জন’, ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে সাধারণ মানুষ

খাবারের প্যাকেটের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘হেলদি’, ‘লো-ফ্যাট’ কিংবা ‘নিউট্রিশন’। কিন্তু চকচকে এই মোড়কের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে মারাত্মক বিপদ। সম্প্রতি দেশজুড়ে চালানো এক চাঞ্চল্যকর সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া সিংহভাগ প্যাকেটজাত খাবারেই রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত চিনি, নুন, কৃত্রিম রং, ফ্লেভার ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, যা মানবদেহের জন্য ‘স্লো পয়জন’ বা ধীর গতির বিষের মতো কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে ২৩ হাজারেরও বেশি খাবার ও পানীয়ের লেবেল এবং ২৫টিরও বেশি উপাদান খতিয়ে দেখে গবেষকরা এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, আমরা প্রতিদিন যে সমস্ত বিস্কুট, চকোলেট, সফট ড্রিঙ্কস বা রেডি-টু-ইট খাবার খাই, সেগুলির অধিকাংশেরই মান অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রায় ৮০ শতাংশ প্যাকেটজাত বিস্কুট ও কুকিজে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম ফ্লেভার এবং পাম অয়েল। শিশুদের প্রিয় ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে মিলেছে নানা রাসায়নিক। এছাড়া, ৮০ শতাংশ প্যাকেটজাত স্ন্যাকসে অতিরিক্ত সোডিয়াম এবং চকোলেটে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট পাওয়া গিয়েছে। কার্বনেটেড পানীয়ের ক্ষেত্রে ৯৮ শতাংশেই রয়েছে কৃত্রিম অ্যাডিটিভ এবং ৭৮ শতাংশ রেডি-টু-ড্রিঙ্ক ডেয়ারি বেভারেজে রয়েছে অতিরিক্ত চিনি।

সচেতনতার অভাব ও বিপণনের ফাঁদ

এই বিপদের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফুড লেবেল বা খাবারের উপাদানের তালিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউট্রিশনের সমীক্ষা বলছে, দেশের ৭৫.৪ শতাংশ মানুষ খাবারের প্যাকেট দেখেন ঠিকই, কিন্তু মাত্র ১৪.৭ শতাংশ মানুষ ভেতরের উপাদানের তালিকা খুঁটিয়ে পড়েন। বেশিরভাগ মানুষই শুধুমাত্র ব্র্যান্ডের নাম কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখেই খাবার কিনে নেন। প্যাকেটজাত খাবারের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে রয়েছে চকচকে বিপণন কৌশল, যেখানে ক্ষতিকর উপাদানগুলিকে আড়াল করে খাবারটিকে স্বাস্থ্যকর হিসেবে প্রচার করা হয়। শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই এখন আল্ট্রা-প্রসেসড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি মানুষের নির্ভরতা হু হু করে বাড়ছে।

ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

চিকিৎসক ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের খাবার নিয়মিত খাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশু ও কিশোররা। খাবারে থাকা অতিরিক্ত চিনি, নুন, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদানগুলি দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতা (ওবেসিটি), ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের মতো মারাত্মক ক্রনিক ব্যাধি ডেকে আনছে। বর্তমানে ভারতে স্থূলতার হার যেভাবে বাড়ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এই আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারকেই চিহ্নিত করছেন গবেষকরা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সুস্থ থাকতে হলে শুধু ক্যালরির হিসাব করলেই চলবে না, খাবারের প্রতিটি উপাদান সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *