নিরাপত্তার গলদ নাকি অতি-আবেগ, যুবভারতীর মেসিকাণ্ডে এবার বিস্ফোরক প্রত্যক্ষদর্শী

নিরাপত্তার গলদ নাকি অতি-আবেগ, যুবভারতীর মেসিকাণ্ডে এবার বিস্ফোরক প্রত্যক্ষদর্শী

যুবভারতীতে লিওনেল মেসির সফরকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা এবং মাঠ ভাঙচুরের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল ফুটবল বিশ্ব। সেই ঘটনার পর খোদ ক্রীড়ামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, উদ্যোক্তাকে যেতে হয়েছে জেলে। কিন্তু সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল মাঠের ভেতরে? এতদিন পর সেই বিস্ফোরক সত্য প্রকাশ্যে এনেছেন কলকাতার বৌবাজারের বাসিন্দা ও প্রাক্তন ফুটবলার সঞ্জয় ঘোষাল, যিনি নিজে সমস্ত নিরাপত্তা বলয় ভেঙে মাঠে ঢুকে মেসির সঙ্গে সেলফি তুলেছিলেন। তাঁর বয়ান অনুযায়ী, সেদিন যুবভারতীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই ঠুনকো ছিল যে, কোনো বাধা ছাড়াই সাধারণ মানুষ ভিভিআইপি জোনে প্রবেশ করেছিল।

খোদাই ছিল না পুলিশ, ভিড়ের চাপে মাঠ ছাড়েন মেসি

সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে সঞ্জয় ঘোষাল জানান, ভিভিআইপি গ্যালারির টিকিট কেটে মাঠে ঢুকেও তিনি অবাক হয়ে দেখেন মিক্সড জোনের সামনের গেটটি সম্পূর্ণ খোলা এবং সেখানে কোনো পুলিশকর্মী উপস্থিত ছিলেন না। কোনো রকম অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ছাড়াই শয়ে শয়ে মানুষ হুড়মুড় করে মাঠে ঢুকে পড়ে। এই সুযোগ হাতছাড়া না করে নিজের টিকিট ছিঁড়ে ফেলে মাঠে ঢুকে পড়েন সঞ্জয়ও। তাঁর দাবি, মাঠে ঢুকে তিনি শুনতে পান তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রীর অনুগামী এবং পুলিশ কর্তাদের পরিবারের লোকজনই কোনো অনুমতি ছাড়া সেখানে ভিড় জমিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে এই অতি-উৎসাহী ভিড়ের কারণেই চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় যুবভারতীতে। পরিস্থিতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে যে মেসির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এনএসজি কমান্ডোরাও ভিড় সামলাতে হিমশিম খান। এমনকি মেসির সতীর্থ রদ্রিগো ডি’পলের হাতে আঁচড় পর্যন্ত লাগে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তড়িঘড়ি মেসি ও সুয়ারেসদের নিয়ে মাঠ ছাড়েন উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত। এর পরই ক্ষুব্ধ জনতা গেট ভেঙে, রেলিং টপকে মাঠে ঢুকে চেয়ার ভাঙচুর করে গোটা যুবভারতী লন্ডভন্ড করে দেয়।

প্রশাসনিক গাফিলতির জের ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাব

এই ঘটনার পর রাজ্য রাজনীতি এবং ক্রীড়ামহলে বড়সড় ঝড় বয়ে যায়। মেসিকাণ্ডের জেরে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে পদত্যাগ করতে হয় এবং উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করা হয়। সম্প্রতি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পালাবদল ঘটতেই এই ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে। জেল থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে শতদ্রু দত্ত তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, পুলিশ আধিকারিক রাজীব কুমারসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর দাবি, প্রশাসনের শীর্ষস্তরের একাংশের ভুলের কারণেই গোটা আয়োজনটি পণ্ড হয়েছিল।

এই আইনি লড়াইয়ে শতদ্রুর পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী সঞ্জয় ঘোষালও। তিনি স্পষ্ট জানান, কোনো রকম রাজনৈতিক যোগাযোগ বা কার্ড ছাড়া তাঁর মতো সাধারণ মানুষের মাঠে ঢুকে যাওয়াটাই প্রমাণ করে সেদিন প্রশাসনের কতটা গাফিলতি ছিল। উদ্যোক্তাকে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি শতদ্রুর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে সাক্ষ্য দিতেও প্রস্তুত। তবে মেসির সঙ্গে সেলফি তুলতে পারলেও, নিজের এই আবেগের বশে করা আচরণের জন্য অনুতপ্ত সঞ্জয়। তাঁর মতে, তাঁদের মতো কিছু মানুষের অতি-আবেগের কারণেই হাজার হাজার সাধারণ দর্শক সেদিন মেসিকে চোখের সামনে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *