বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারতের বাজার কেন শান্ত?

হরমুজ প্রণালীর সাম্প্রতিক সংকটের জেরে বিশ্বজুড়ে তেলের যোগানে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে তা ১১০ ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের একাধিক দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম হু হু করে বাড়লেও, ভারতে জ্বালানির দাম তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। GlobalPetrolPrices-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ভারতে পেট্রোলের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম মাত্র ৪.৪ শতাংশ বেড়েছে। অথচ এই একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে পেট্রোলের দাম ৮৯.৭ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ১১২.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং ইউরোপের একাধিক দেশেও জ্বালানির দাম বিপুল হারে বেড়েছে।
শুল্ক হ্রাস ও সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার বোঝা সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলেও ভারত সরকার ভিন্ন পথ হেঁটেছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে একাধিকবার আবগারি শুল্ক (excise duty) ও খুচরো দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২১ সালের নভেম্বর এবং ২০২২ সালের মে মাসে আবগারি শুল্ক কমানোর পর, ২০২৪ সালের মার্চে খুচরো দাম এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে আবারও আবগারি শুল্ক কমানো হয়। সর্বশেষ, ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ স্পেশাল অ্যাডিশনাল এক্সাইজ ডিউটি (SAED) কমানোর ফলে পেট্রোলের ওপর আবগারি শুল্ক কমে লিটার প্রতি ৩ টাকা এবং ডিজেলের ওপর শূন্য হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সংকটের সময় দাম বাড়ার একটা বড় অংশ সরকারি রাজস্ব এবং তেল বিপণন সংস্থাগুলো নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব সীমিত চিল। শুধুমাত্র ২০২৬ সালের মার্চের শুল্ক কমানোর ফলেই সরকারি কোষাগারে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি, ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তেল বিপণন সংস্থাগুলোকে দেওয়া ১.৩৪ লক্ষ কোটি টাকার অয়েল বন্ডের মধ্যে গত কয়েক বছরে সুদসহ ১.৩০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি মূলধন শোধ করা হয়েছে।
রাজ্যে রাজ্যে দামের তারতম্যের কারণ
ভারতজুড়ে তেলের দাম সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পেট্রোল ও ডিজেলের দামে ফারাক দেখা যায়। এর মূল কারণ হলো পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে ভ্যাট (VAT) বা ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্সের হারের ভিন্নতা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং কেরালায় ভ্যাটের হার বেশি হওয়ায় জ্বালানির দাম অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, গোয়া এবং আসামের মতো রাজ্যগুলোতে ভ্যাটের হার কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম দামে পেট্রোল ও ডিজেল কিনতে পারছেন।