বন্দে মাতরম বিতর্কে উত্তাল কেরল, কংগ্রেসকে ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ বামেদের

তামিলনাড়ুর পর এবার কেরল। নবনির্বাচিত কংগ্রেস সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়াকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সোমবার কেরলের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরমের সম্পূর্ণ স্তবক গাওয়া হয়। এর পরেই বিজয়ী কংগ্রেস জোট ইউডিএফ (UDF) সরকারের কড়া সমালোচনায় সরব হয়েছে বিরোধী বাম শিবির। তাদের দাবি, বহুত্ববাদী ভারতীয় সমাজে বন্দে মাতরমের সম্পূর্ণ স্তবক গাওয়া কোনোভাবেই উপযুক্ত নয় এবং এটি দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনার পরিপন্থী।
ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের স্মারক ও বামেদের তোপ
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সিপিআই নেতা বিনয় বিশ্বম ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে কংগ্রেসকে ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, বন্দে মাতরমের কিছু পঙক্তি এক বিশেষ ধরনের চিন্তাধারার জন্ম দেয়, যা জওহরলাল নেহরু বা মহাত্মা গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। সেই কারণেই এর কয়েকটি অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে কেরলের সিপিএম নেতৃত্বও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ১৯৩৭ সালে খোদ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এবং পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে ভারতের গণপরিষদ স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, বন্দে মাতরমের প্রথম আটটি পঙক্তিকেই কেবল জাতীয় গান হিসেবে গণ্য করা হবে। বামেদের অভিযোগ, কংগ্রেস এখন নিজেদের সেই ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাস ভুলতে বসেছে।
তীব্র কটাক্ষ বিজেপির ও দায় এড়ানোর চেষ্টা কংগ্রেসের
এদিকে এই পুরো বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে কেরলের নতুন কংগ্রেস সরকার। সরকারি সূত্রের দাবি, এই অনুষ্ঠানটি কেরলের লোক ভবন দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল, তাই কর্মসূচির খুঁটিনাটিতে সরকারের কোনো সরাসরি ভূমিকা ছিল না।
তবে এই ইস্যুতে বামেদের কড়া জবাব দিয়েছে বিজেপি। কেরল বিজেপির সভাপতি তথা বিধায়ক রাজীব চন্দ্রশেখর অভিযোগ করেছেন, বামপন্থীরা ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। মার্কসবাদকে একটি ‘আমদানি করা মতাদর্শ’ বলে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন, একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে তুষ্ট করতেই বামেরা জাতীয় গানকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং ভারতের আসাম্মান করছে।
বিতর্কের কারণ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
মূলত জাতীয়তাবাদের প্রতীক বন্দে মাতরমের ব্যবহার এবং এর ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতার ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার কারণেই এই বিতর্কের সূত্রপাত। বামেদের মতে, এর সম্পূর্ণ অংশ একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ভাবাবেগকে উসকে দেয়, যা বহুত্ববাদের পরিপন্থী। অন্যদিকে, বিজেপির কাছে এটি দেশাত্মবোধ ও সংস্কৃতির অবমাননা।
এই বিতর্কের ফলে কেরলের রাজনীতিতে মেরুকরণের রাজনীতি আরও তীব্র হতে পারে। একদিকে বামেরা যেখানে সংখ্যালঘু ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোটব্যাঙ্ককে সংহত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিজেপি একে হাতিয়ার করে জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জমি শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই দুই শিবিরের টানাটানিতে কেরলের নতুন কংগ্রেস সরকার আগামী দিনে আরও নীতিগত চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।