তৃণমূলের বিক্ষোভে অনুপস্থিত ৫০ বিধায়ক, ‘ডিউটি ভাগ’ করার সাফাই কুণাল ঘোষের

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এবার খোদ বিধানসভা চত্বরেই তৃণমূলের পরিষদীয় দলের শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। ভোট-পরবর্তী হিংসা ও শহরজুড়ে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বুধবার বিধানসভার আম্বেদকর মূর্তির পাদদেশে এক ধর্ণা-বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৩০ জন সেখানে উপস্থিত থাকায় এবং খোদ দলের ৫০ জন বিধায়ক গরহাজির থাকায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এই বিপুল অনুপস্থিতি নিয়ে বিরোধী দল বিজেপি যখন ‘তৃণমূলে ভাঙন’ ও ‘নিষ্ক্রিয়তা’র তত্ত্ব খাড়া করে আক্রমণ শানাচ্ছে, ঠিক তখনই দলের পক্ষ থেকে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামলেন প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ।
৮০ জনের মধ্যে মাত্র ৩০ জন উপস্থিত, কটাক্ষ বিজেপির
বুধবার বিধানসভা চত্বরে আয়োজিত এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে প্রথম থেকেই বিধায়কদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত চোখে পড়ার মতো কম। দলের ৫০ জন বিধায়কের এই গরহাজির থাকার ঘটনাকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছে বিজেপি শিবির।
বিরোধী নেতৃত্বের দাবি:
- ফলতার জাহাঙ্গির খানের পিছু হটে যাওয়া, দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারি, এবং উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহের পর তৃণমূলের বিধায়কেরা এখন খোদ দলীয় কর্মসূচিতে আসতেই ভয় পাচ্ছেন।
- দলের রাশ যে শীর্ষ নেতৃত্বের হাত থেকে আলগা হয়ে গিয়েছে, এই বিপুল অনুপস্থিতিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
সবাই ধর্ণায় বসলে আক্রান্তদের পাশে কে দাঁড়াবে? যুক্তি কুণালের
তৃণমূলের অন্দরের এই চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এবং বিজেপির কটাক্ষের জবাবে বুধবার বিকেলে দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন কুণাল ঘোষ। বিধায়কদের অনুপস্থিতির পেছনে কোনো রকম ক্ষোভ বা দলবদলের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেন:
“আমাদের পরিষদীয় দলের বৈঠকেই এই বিষয়ে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আমরা দলের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছি। পরিষদীয় দলের রণকৌশল অনুযায়ী ঠিক হয়েছে যে, আমরা কয়েকজন বিধায়ক ও নেতা এখানে বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে ধর্ণায় বসব। আর বাকি বিধায়কেরা যার যার নিজের এলাকায় থাকবেন।”
কুণাল ঘোষ আরও যোগ করেন, “রাজ্যজুড়ে আমাদের দলের বহু কর্মী-সমর্থক আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং এই সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে থাকাটাও তো আমাদের সমান দায়িত্ব। সবাই যদি কলকাতায় এসে ধর্ণায় বসে থাকে, তবে এলাকায় আক্রান্তদের পাশে কে দাঁড়াবে? তাই এটা কোনো অনুপস্থিতি নয়, এটি দলের সুপরিকল্পিত ডিউটি অ্যালটমেন্ট।”
ঋতব্রতর বিদ্রোহ ও মতিবুরের দিল্লি সফরের মাঝেই নতুন জল্পনা
কুণাল ঘোষ ‘দায়িত্ব ভাগ’ করার তত্ত্ব খাড়া করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই যুক্তি পুরোপুরি মেনে নিতে পারছেন না। কারণ, এর আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা কালীঘাটের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠকেও ১৫ জন বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন, যাঁর মধ্যে হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক মতিবুর রহমান বর্তমানে কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের সঙ্গে দেখা করতে দিল্লিতে রয়েছেন বলে জল্পনা।
তার ওপর আজই উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আইপ্যাক’ ও দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি নিয়ে মুখ বন্ধ রাখার বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে ১৫ দিনের ডেডলাইন দিয়েছেন। এই সমস্ত ব্যাক-টু-ব্যাক ঘটনার রেশ ধরে, বিধানসভার বিক্ষোভে ৫০ জন বিধায়কের অনুপস্থিতি ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, সেই জল্পনাকেই আরও উস্কে দিল।