‘কাউন্সিলর থাকব, কিন্তু বরো চেয়ারম্যান পদ ছাড়ছি!’ ফিরহাদ-ঘনিষ্ঠ দেবলীনা বিশ্বাসের ইস্তফায় চরম অস্বস্তিতে তৃণমূল

কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের অন্দরে এবং কলকাতা পুরসভার (KMC) ৯ নম্বর বরো এলাকায় এক বিরাট রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটে গেল। মেয়রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বলে পরিচিত ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর দেবলীনা বিশ্বাস আচমকাই তাঁর বরো চেয়ারপার্সনের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। মঙ্গলবারই তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র সরাসরি মেয়র ফিরহাদ হাকিমের দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে পুরসভা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ছাব্বিশের রাজনৈতিক ডামাডোলে যেখানে একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে পুরসভার বুলডোজার নোটিশ জারি হচ্ছে, ঠিক তখনই মেয়রের খাসতালুকে এই হাই-প্রোফাইল ইস্তফা ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ ফাটল ও অস্বস্তিকে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
‘সম্পূর্ণ দলগত কারণেই এই সিদ্ধান্ত’, বিস্ফোরক দেবলীনা
হঠাৎ কেন এই পদত্যাগ? এই প্রশ্ন করা হলে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের ক্ষোভ ও অভিমান উগরে দিয়েছেন দেবলীনা বিশ্বাস। তবে কোনো ব্যক্তিগত কারণ বা শারীরিক অসুস্থতার দোহাই না দিয়ে, তিনি সরাসরি দলের ভেতরের সমীকরণকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে কাউন্সিলর দেবলীনা বিশ্বাস স্পষ্ট জানান:
“আমি কাউন্সিলর হিসেবে এলাকার মানুষের কাজ করব বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতদিন তো বরো চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, কিন্তু এখন আর ওখানে থাকতে চাই না, তাই সরে আসছি। আমি স্পষ্ট করে দিতে চাই, এই সিদ্ধান্ত আমি সম্পূর্ণ দলগত কারণেই (Party Reasons) নিয়েছি।”
ফিরহাদের ডানহাত হিসেবে পরিচিত, নেপথ্যে কি অন্য সমীকরণ?
কলকাতা পুরসভার আলিপুর, চেতলা এবং ভবানীপুরের মতো হাই-প্রোফাইল এলাকাগুলি নিয়ে গঠিত এই ৯ নম্বর বরো। এই বরোর চেয়ারপার্সন পদটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেবলীনা বিশ্বাসকে পুরসভার অলিন্দে মেয়রের ‘ডানহাত’ বা অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি বলে গণ্য করা হতো।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর এই আচমকা ইস্তফা এবং ‘দলগত কারণ’ উল্লেখ করার পেছনে গভীর কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা ক্ষমতার টানাপোড়েন রয়েছে। নতুন শুভেন্দু অধিকারী সরকারের জমানায় যখন পুরসভার বেআইনি নির্মাণ ও পুরোনো ফাইলের জট খুলতে একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তখন মেয়রের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের এই ভাঙন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তাসের ঘরের মতো ভাঙছে কলকাতা পুরসভার অভ্যন্তরীণ একতা
আজ সকালেই উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের দুর্নীতি ও আইপ্যাকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। আর বিকেলের মধ্যেই খোদ কলকাতা পুরসভার অন্দর থেকে দেবলীনা বিশ্বাসের এই ইস্তফা প্রমাণ করছে যে, শাসক দলের নিচুতলা থেকে ওপরতলা— সর্বত্রই এক গভীর সমন্বয়হীনতা ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মেয়রের অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়েও দেবলীনা কেন ‘দলগত কারণে’ চেয়ারপার্সনের পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন, তা নিয়ে এখন আলিপুর ও কালীঘাটের অলিন্দে জল্পনা তুঙ্গে। এখন দেখার, মেয়র ফিরহাদ হাকিম তাঁর এই ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলরের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে তাঁকে মানানোর চেষ্টা করেন।