‘আমরা একটি গর্বিত গণতান্ত্রিক দেশ’, পশ্চিমা মিডিয়াকে দিল্লির কড়া জবাব, মোদীকে রাহানের খোঁচায় পাল্টা অমিত মালব্য
নরওয়েতে ভারত ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীদের যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক হেলে লিং-এর বেমক্কা প্রশ্ন এবং তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলা তুমুল আলোড়নের রেশ এবার আছড়ে পড়ল ভারতের বিদেশ মন্ত্রকে (MEA)। ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার একাংশের লাগাতার একপেশে সমালোচনার বিরুদ্ধে এবার নজিরবিহীনভাবে তীব্র ক্ষোভ ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানাল নয়াদিল্লি।
বিদেশ মন্ত্রকের তরফ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভারতের মতো এক বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের বহুত্ববাদ, জটিল সামাজিক পরিকাঠামো এবং বহুস্তরীয় গণতান্ত্রিক ইকোসিস্টেমকে সঠিক ভাবে বুঝতে পশ্চিমা দুনিয়া পুরোপুরি ব্যর্থ।
হাবিজাবি এনজিও-র রিপোর্ট পড়ে প্রশ্ন করতে চলে আসেন! তোপ সিবি জর্জের
রাজধানী ওসলো-য় নরওয়ের ওই সাংবাদিক ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’ (World Press Freedom Index)-এ ভারতের অবস্থান নিয়ে শোরগোল তোলার পর, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সেক্রেটারি (ওয়েস্ট) সিবি জর্জ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর পক্ষে সওয়াল করেন। পশ্চিমা মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একহাত নিয়ে তিনি বলেন:
“আমরা প্রতিনিয়ত শুনতে পাই এটা কেন, সেটা কেন? জেনে রাখুন, ভারতের সংবিধান এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। আমাদের দেশে নারীদের সমানাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই ভারতের নারী ও পুরুষ একসঙ্গে ভোটাধিকার অর্জন করেছিল, অথচ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে মেয়েদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছে পুরুষদের অনেক পরে। আমাদের দেশে কারও অধিকার লঙ্ঘন হলে সরাসরি আদালতের দরজায় যাওয়া যায়। আমরা একটি গর্বিত গণতান্ত্রিক দেশ।”
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ক্ষুদ্র মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে সিবি জর্জ আরও যোগ করেন, “আপনারা কি জানেন ভারতে সারা দিনে কত ব্রেকিং নিউজ আসে? শুধু দিল্লিতেই হিন্দি ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা মিলিয়ে অন্তত দু’শোটি ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল ২৪X৭ সচল রয়েছে। মানুষের কোনো ধারণাই নেই ভারত কত বড়! আপনারা দুটো হাবিজাবি এনজিও-র তৈরি করা ভুয়ো রিপোর্ট পড়ে নিয়ে একটা এত বড় দেশ সম্পর্কে আসাম্পূর্ণ ও ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করেন, আর তারপর চলে আসেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রশ্ন করতে! কোনো ক্ষুদ্র বা একপেশে মাপকাঠিতে ভারতকে মাপা যায় না।”
‘কম্প্রোমাইজড পিএম’ বনাম ‘জয়েন্ট প্রেস ব্রিফিং’: তুঙ্গে রাহুল-মালব্য যুদ্ধ
ওসলোর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিদেশের মাটিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন নরওয়েজিয়ান সাংবাদিকের প্রশ্ন নিলেন না এবং ভারতের প্রেস ফ্রিডম নিয়ে কেন নীরব রইলেন— তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। মোদীকে তীব্র কটাক্ষ করে রাহুল বলেন, “বিদেশের মাটিতে প্রশ্ন না নিয়ে কীসের ভয় বা প্যানিক? উনি আসলে একজন কম্প্রোমাইজড পিএম (Compromised PM)।”
রাহুল গান্ধীর এই আক্রমণাত্মক পোস্টের জবাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা মেগা কাউন্টার অ্যাটাক শাণিয়েছেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান (IT Cell Chief) অমিত মালব্য। রাহুলকে আয়না দেখিয়ে মালব্য বলেন:
“অসলোর অনুষ্ঠানটি কোনো খোলামেলা সাংবাদিক সম্মেলন ছিল না, ওটি ছিল দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি পূর্বনির্ধারিত ‘জয়েন্ট প্রেস ব্রিফিং’। রাহুল গান্ধী হয়তো জানেন না বা জেনেও নাটক করছেন যে, ওই যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রোটোকল মেনে শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীই নন, খোদ নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরও সাংবাদিকদের কাছ থেকে কোনো প্রশ্ন নেননি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম না বুঝেই সস্তার রাজনীতি করছেন বিরোধী দলনেতা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যখন আমলা ও পুলিশকর্তাদের ফাইল ফাঁস রুখতে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে কড়া ‘সেন্সর’ গাইডলাইন জারি হয়েছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে নয়াদিল্লির এই অত্যন্ত আগ্রাসী ও কড়া জবাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরি করা একপেশে ইন্ডেক্স বা সূচককে যে ভারত আর বিন্দুমাত্র রেয়াত করবে না, তা সাউথ ব্লকের এই কড়া বিবৃতি থেকেই পরিষ্কার।