স্প্লিট নাকি উইন্ডো, তীব্র গরমে পকেট বাঁচাতে কোন এসি কিনবেন ক্রেতারা?

স্প্লিট নাকি উইন্ডো, তীব্র গরমে পকেট বাঁচাতে কোন এসি কিনবেন ক্রেতারা?

গরমকালের তীব্র দাবদাহ থেকে বাঁচতে এসি বা এয়ার কন্ডিশনার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম জরুরি অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। তবে এসি কেনার আনন্দের পাশেই যে বড় দুশ্চিন্তাটি এসে কড়া নাড়ে, তা হলো মাসের শেষে বিদ্যুতের আকাশছোঁয়া বিল। বাজারচলতি এসিগুলোর মধ্যে মূলত দুটি মডেল সবচেয়ে জনপ্রিয়— উইন্ডো এসি এবং স্প্লিট এসি। নতুন এসি কেনার আগে অধিকাংশ ক্রেতার মনেই সাধারণ একটি প্রশ্ন ঘোরে, কোন এসি-তে বিল কম আসবে? উভয় এসির কার্যক্ষমতা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং প্রযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে এর একটি স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়।

কোন এসিতে বিল কেমন আসবে, তা বুঝতে গেলে প্রথমে দুই ধরনের এসির গঠনগত এবং প্রযুক্তিগত পার্থক্য জানা জরুরি। উইন্ডো এসির ক্ষেত্রে সমস্ত কলকব্জা যেমন কম্প্রেসর, কন্ডেনসার, ইভাপোরেটর ইত্যাদি একটিমাত্র বক্সের ভেতরেই বন্দি থাকে এবং সাধারণত ঘরের জানালার মাপ কেটে এটি বসানো হয়। অন্যদিকে, স্প্লিট এসির দুটি আলাদা অংশ থাকে। ঘরের ভেতরের দেওয়ালে থাকে হালকা ‘ইনডোর ইউনিট’ এবং ঘরের বাইরে বা ছাদে বসানো হয় ভারী ‘আউটডোর ইউনিট’, যার মধ্যে মূলত কম্প্রেসরটি থাকে।

বিল কম আসার আসল চাবিকাঠি ইনভার্টার প্রযুক্তি

বিলের আসল তারতম্য গড়ে দেয় আধুনিক ‘ইনভার্টার’ প্রযুক্তি। এক দশক আগে পর্যন্ত উইন্ডো এবং স্প্লিট এসির বিদ্যুৎ খরচে খুব বেশি তফাত ছিল না। কিন্তু বাজারে ইনভার্টার প্রযুক্তির প্রবেশের পর সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। ইনভার্টার প্রযুক্তি হলো এমন একটি মেকানিজম, যা ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী কম্প্রেসরের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ঘর পর্যাপ্ত ঠান্ডা হয়ে গেলে ইনভার্টার কম্প্রেসরটি পুরোপুরি বন্ধ না করে খুব কম গতিতে চালু রাখে, ফলে নতুন করে স্টার্ট নেওয়ার বাড়তি বিদ্যুৎ খরচ বেঁচে যায়। বর্তমানে বাজারে উপলব্ধ ৯০ শতাংশেরও বেশি স্প্লিট এসি ইনভার্টার প্রযুক্তিসম্পন্ন। অন্যদিকে, উইন্ডো এসির ক্ষেত্রে ইনভার্টার মডেলের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং বেশিরভাগ উইন্ডো এসিই ‘নন-ইনভার্টার’ হয়ে থাকে। স্বভাবতই, একটি ইনভার্টার স্প্লিট এসি সাধারণ উইন্ডো এসির তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে। ফলে মাসের শেষে স্প্লিট এসিতেই বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম আসে।

এসি কেনার সময় ব্যুরো অব এনার্জি এফিসিয়েন্সি (BEE) প্রদত্ত ‘স্টার রেটিং’ লেবেলটি ভালো করে লক্ষ্য করা উচিত। ৩-স্টার বা ৫-স্টার রেটিং যত বেশি হবে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় তত বেশি হবে। দেখা গেছে, একটি ৫-স্টার রেটিং যুক্ত ইনভার্টার স্প্লিট এসি, একটি ৩-স্টার রেটিং যুক্ত উইন্ডো এসির চেয়ে অনেক কম বিদ্যুৎ টানে। তবে যদি উইন্ডো এসির মধ্যেও ৫-স্টার ইনভার্টার মডেল পাওয়া যায়, তবে সেটির বিদ্যুৎ খরচ স্প্লিট এসির কাছাকাছিই হবে। কিন্তু প্রযুক্তির বিবর্তনে স্প্লিট এসির কুলিং এফিসিয়েন্সি বা ঘর ঠান্ডা করার ক্ষমতা উইন্ডো এসির চেয়ে সবসময় কিছুটা এগিয়ে থাকে।

খরচ ও সুবিধার তুলনামূলক প্রভাব

বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি এই দুই এসির কিছু নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। স্প্লিট এসির প্রাথমিক দাম এবং দেওয়ালে ফিটিং করানোর খরচ উইন্ডো এসির তুলনায় বেশি। তবে স্প্লিট এসির কম্প্রেসরটি ঘরের বাইরে থাকায় ঘর থাকে একদম শান্ত। অন্যদিকে উইন্ডো এসির দাম বেশ সাধ্যের মধ্যে এবং এটি সহজেই জানালায় বসানো যায় বলে ইনস্টলেশন খরচ কম, কিন্তু সমস্ত মেকানিজম ঘরের ভেতরে থাকায় এটি চলার সময় কিছুটা ঘড়ঘড় শব্দ হয়।

যদি মূল লক্ষ্য হয় মাসের শেষে বিদ্যুতের বিল বাঁচানো, তবে একটি ভালো ব্র্যান্ডের ইনভার্টার স্প্লিট এসি (বিশেষত ৪ বা ৫ স্টার) কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। প্রাথমিক ক্রয়ের খরচ একটু বেশি হলেও, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিলের সাশ্রয় সেই টাকা উসুল করে দেবে। তবে বাজেট যদি সীমিত হয়, ঘর যদি ভাড়ার বাড়ি হয় এবং দিনে মাত্র ২-৩ ঘণ্টা এসি চালানোর পরিকল্পনা থাকে, তবেই কেবল উইন্ডো এসি বেছে নেওয়া যেতে পারে। অবশ্য শুধু এসি কেনাই নয়, সঠিক তাপমাত্রায় (২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এসি চালানো এবং নিয়মিত ফিল্টার পরিষ্কার রাখার ওপরেও বিলের কম-বেশি হওয়া নির্ভর করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *