ভারতের রাজনীতিতে চমকপ্রদ দলনাম ও তাদের পেছনের গল্প!

ভারতের রাজনীতিতে চমকপ্রদ দলনাম ও তাদের পেছনের গল্প!

ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা আড়াই হাজারের পার। এর মধ্যে জাতীয় ও রাজ্যস্তরের প্রথম সারির দলগুলোর বাইরে এমন কিছু ছোট ও আঞ্চলিক দল রয়েছে, যাদের নাম শুনলে সাধারণ মানুষের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। নির্বাচন কমিশনের খাতায় নথিভুক্ত এই দলগুলোর কোনোটি তৈরি হয়েছে বিশেষ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে, কোনোটি নির্দিষ্ট সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে, আবার কোনোটির জন্ম হয়েছে স্রেফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রসাত্মক ট্রোল বা ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন থেকে।

নামের বাহার ও অদ্ভুত রাজনৈতিক পরিচয়

আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে অনেক দলই চমকপ্রদ নাম বেছে নেয়। যেমন উত্তরপ্রদেশের ‘নিশাদ পার্টি’, যার পোশাকি নাম ‘নির্ভল ইন্ডিয়ান শোষিত হামারা আম দল’। দীর্ঘ নামের এই দলটি উত্তরপ্রদেশের জেলে ও নিষাদ সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। আবার বিহারের মুকেশ সাহানির দল ‘বিকাশশীল ইনসান পার্টি’ সংক্ষেপে ‘ভিআইপি’ নামে পরিচিত, যা শুনলে কোনো বিলাসবহুল ক্লাবের কথা মনে আসাই স্বাভাবিক। দলিত রাজনীতির পরিচিত মুখ রামবিলাস পাসোয়ানের ‘লোক জনশক্তি পার্টি’ নামের মধ্যেও রয়েছে এক অভিনবত্ব। এছাড়া ‘পাবলিক পলিটিক্যাল পার্টি’র মতো অত্যন্ত সাধারণ নামের দলও ভারতের রাজনীতিতে বিদ্যমান।

সবচেয়ে বড় চমক জাগায় ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মিম সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা দলগুলো। বেকারত্ব ও প্রচলিত শাসনব্যবস্থাকে কটাক্ষ করে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (আরশোলা জনতা পার্টি) কিংবা ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ (জাতীয় পরজীবী মোর্চা) মূলত কোনো নির্বাচনী দল নয়, বরং নেটদুনিয়ার তীব্র ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন। অন্যদিকে, বেকারত্ব ও দুর্নীতি দমনের মতো সুনির্দিষ্ট ইস্যুকে সামনে রেখে ‘আখিল ভারতীয় বেরোজগার পার্টি’ কিংবা ‘আখিল ভারতীয় দুর্নীতি নির্মূল সেনা’র মতো দলগুলো গড়ে উঠেছে। যুবসমাজ ও ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়ে তৈরি ‘ভারতীয় নয়ী সোচ সমান্তা পার্টি’ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেশ চর্চিত।

অদ্ভুত নামকরণের কারণ ও সামাজিক প্রভাব

ভারতে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অদ্ভুত নাম রাখার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারতের মতো বিশাল বৈচিত্র্যময় দেশে প্রান্তিক বা নির্দিষ্ট কোনো জাতিগত পরিচয়কে সরাসরি তুলে ধরার জন্য এমন নামকরণ করা হয়। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও বেকারত্বের মতো স্পর্শকাতর সামাজিক ইস্যুগুলোকে পুঁজি করে ভোটারদের আবেগ আকর্ষণের চেষ্টা থাকে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভিড়ে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক মনোযোগ কাড়তে অনেকেই চমকপ্রদ ও ব্যতিক্রমী নাম বেছে নেন।

নির্বাচনী রাজনীতিতে এই ছোট বা ব্যঙ্গাত্মক দলগুলোর সিংহভাগের প্রভাব অত্যন্ত সীমিত এবং এদের অনেককে ভোট ময়দানে দেখাই যায় না। তবে এই দলগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে, ভারতের রাজনীতি শুধু বড় ও ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এখানে ব্যঙ্গ-কৌতুক ও প্রান্তিক দাবিদাওয়া প্রকাশের এক অদ্ভুত মিশ্রণ রয়েছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *