দেবরাজ ও অদিতির সম্পত্তি কি ১০০ কোটি, হাইকোর্টে ঝড়ের বেগে সওয়াল-জবাবের পর তলব রিপোর্ট!

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় আয়ের সঠিক তথ্য গোপন এবং আয় বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। গ্রেফতারির আশঙ্কা থেকে আগেভাগেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন রাজারহাট-গোপালপুরের তৃণমূল প্রার্থী অদিতি মুন্সি ও তাঁর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তী। শুক্রবার সেই মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট দেবরাজ ও অদিতির সম্পত্তি নিয়ে তদন্তের অগ্রগতি রিপোর্ট তলব করেছে। আগামী ১৯ জুনের মধ্যে এই রিপোর্ট আদালত জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের মৌখিক আশ্বাসে পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত স্বস্তি পেলেন এই দম্পতি, আপাতত তাঁদের গ্রেফতার করা যাবে না।
আদালতে তীব্র তরজা ও শাহজাহান প্রসঙ্গ
শুনানি চলাকালীন আদালতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ তৈরি হয়। অদিতি ও দেবরাজের আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য দাবি করেন, সম্পত্তি হস্তান্তর কোনও অবৈধ কাজ নয় এবং এতে কেউ বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেননি। প্রয়োজনে ইনকাম ট্যাক্স দফতর বিষয়টি দেখতে পারে। হলফনামায় মিথ্যে তথ্য দেওয়াকে তিনি একটি ‘ইলেক্টোরাল অপরাধ’ বলে উল্লেখ করেন, যা কোনও ক্রিমিনাল অপরাধ নয়।
পাল্টা যুক্তিতে রাজ্যের আইনজীবী রাজদীপ মজুমদার প্রশ্ন তোলেন, মাত্র একদিনে কীভাবে এত কোটি টাকার সম্পত্তি বদল হয় এবং এই টাকা কোথা থেকে এল? একে একটি ‘অরগানাইজ ক্রাইম’ বা সংগঠিত অপরাধ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই প্রেক্ষিতে বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত সন্দেশখালির প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করেন, “শেখ শাজাহানের কথা মনে আছে? এরা বিধায়ক ছিলেন বলে কেউ ভয়েতে হয়ত অভিযোগ করতে পারেনি।” তবে বিচারপতি আরও যোগ করেন যে, কেউ অত্যাচারিত হয়েছেন বলে যেহেতু সরাসরি অভিযোগ নেই, তাই একে এখনই সংগঠিত অপরাধ বলা যাবে না।
আয় ও গাড়ির মূল্যে বিস্তর অসঙ্গতি
শুনানিতে রাজ্যের অপর এক আইনজীবী কুমারজ্যোতি তিওয়ারি এই দম্পতির আয় ও সম্পত্তির হিসাব তুলে ধরে বড়সড় অসঙ্গতির দাবি করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অদিতি মুন্সির আয় ৪০ লক্ষ টাকা এবং দেবরাজের আয় ৬৬ লক্ষ ৯৭ হাজার ০৪০ টাকা। অথচ তাঁদের কেনা তিনটি গাড়ির মোট মূল্যই ৭১ লক্ষ টাকা। এর বাইরে তাঁদের অধীনে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এই এলাকার দুই কাউন্সিলর ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন বলেও আদালতকে জানানো হয়।
ভোটের আগের অভিযোগ এবং সম্ভাব্য প্রভাব
এই মামলার মূল প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ভোটের ঠিক একদিন আগে, যখন বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থানায় অদিতি মুন্সির বিরুদ্ধে মনোনয়নপত্রে তথ্য গোপনের অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর দাবি ছিল, অদিতি ও দেবরাজ কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রচুর জমি কিনলেও তার বিক্রয়মূল্য মনোনয়নপত্রের কোথাও উল্লেখ করেননি। এমনকি চলতি বছরের ২৫ মার্চ বিক্রি করা একটি জমির মূল্যও গোপন করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টের এই রিপোর্ট তলবের নির্দেশ এবং তদন্তের অগ্রগতি আগামী দিনে এই রাজনৈতিক দম্পতির জন্য বড়সড় আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। যদি ১৯ জুনের রিপোর্টে আয়ের উৎসে বড় ধরনের অসঙ্গতি বা বেআইনি লেনদেন প্রমাণিত হয়, তবে তা তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সামাজিক ভাবমূর্তিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।