কলকাতা পুরসভার সচিব-হেনস্থা কাণ্ডে তলব বৈশ্বানরকে! শাসক-প্রশাসনের নজিরবিহীন টানাপড়েনে উত্তাল পুরভবন

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার শাসক দল ও আমলাতন্ত্রের সংঘাতের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটল কলকাতা পুরসভায়। পুরসভার সচিব কিশোরকুমার বিশ্বাসকে ঘরে ঢুকে হেনস্থা ও চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগে নিউ মার্কেট থানার পুলিশের তরফে তলব করা হলো কলকাতার মেয়র পারিষদ (তৃণমূল) বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে। ৪ মে বাংলায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পুরবোর্ডে থাকা তৃণমূলের সঙ্গে পুর প্রশাসনের এই টানাপড়েন চলছিল, যা রবিবার আইনি নোটিসের জেরে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার রূপ নিল।
অধিবেশন বাতিলকে কেন্দ্র করে সংঘাতের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহের শুক্রবারের একটি পুর অধিবেশনকে কেন্দ্র করে। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী কলকাতা পুরসভার অধিবেশন বসার কথা থাকলেও, তার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে আকস্মিক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা করেন। প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষুব্ধ হন তৃণমূল কাউন্সিলরেরা। শুক্রবার দুপুরে পুরভবনের কাউন্সিলর ক্লাবে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন তাঁরা। তাঁদের দাবি ছিল, নির্ধারিত সূচি মেনেই অধিবেশন করতে হবে এবং তার জন্য অবিলম্বে কাউন্সিল চেম্বার খুলে দিতে হবে।
সচিবের ঘরে চড়াও হওয়ার অভিযোগ ও সুদীপ পোল্লের গ্রেপ্তার
এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বোরো-১৬-র চেয়ারম্যান সুদীপ পোল্লে সহ মোট ছয়জন তৃণমূল কাউন্সিলর পুরসভার সচিব কিশোরকুমার বিশ্বাসের ঘরে যান। পুর প্রশাসনের অভিযোগ, সেই সময়ে সচিবকে কর্তব্যরত অবস্থায় চরম হেনস্থা করা হয় এবং নিয়ম বহির্ভূতভাবে অধিবেশন চালু করার জন্য তাঁর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। ঘটনার পরেই পুর আধিকারিকদের পক্ষ থেকে নিউ মার্কেট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
তৃণমূলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে, ওই দিন বৈশ্বানরের সঙ্গে সচিবের ঘরে উপস্থিত থাকা বোরো-১৬-র চেয়ারম্যান সুদীপ পোল্লেকে শনিবারই একটি তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ। এর পরদিনই খোদ মেয়র পারিষদকে পুলিশের তলব শাসক শিবিরের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, বাকি কাউন্সিলরদেরও ডাকার সম্ভাবনা
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় হাজিরার নোটিস পাঠানো হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত মেয়র পারিষদ জানিয়েছেন, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন; তবে ঠিক কবে তিনি থানায় যাবেন তা স্পষ্ট করেননি। এদিকে পুলিশ এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে পুরসভার ওই ঘরের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখা এবং উপস্থিত কর্মীদের বয়ান রেকর্ড করার কাজ শুরু করেছে। ওই দিন উপস্থিত থাকা বাকি চার তৃণমূল কাউন্সিলরকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হতে পারে বলে লালবাজার সূত্রে খবর। রাজনৈতিক মহলের মতে, পুরবোর্ডে তৃণমূলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও নতুন বিজেপি সরকারের অধীনে পুর প্রশাসনের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ যে আলগা হচ্ছে, এই ঘটনা তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।