ফলতায় রাজনৈতিক ভূমিকম্প, তৃণমূলের দুর্গে বিজেপির ঐতিহাসিক হানা

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা আসনের পুনঃনির্বাচনে এক ঐতিহাসিক জয় লাভ করেছে বিজেপি। এই অভাবনীয় ফলাফলে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে। নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই(এম) প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মিকে ১,০৯,০২১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। অন্যদিকে, এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। দলের প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান মাত্র ৭,৭৮৩ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে চলে গেছেন এবং তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এই বিপুল জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একে ‘গণতন্ত্রের জয় এবং হুমকির পরাজয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভোটের সমীকরণ ও তৃণমূলের বিপর্যয়
দীর্ঘদিন ধরে ফলতা আসনটি তৃণমূলের রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনেও এই আসনে টিএমসি প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে অনায়াসে জয়ী হয়েছিল। তবে এবারের পুনঃনির্বাচনে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ২০২১ সালে যেখানে বিজেপির ভোট শেয়ার ছিল ৩৬.৭৫ শতাংশ, এবার তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১.২ শতাংশে। বিপরীতে, তৃণমূলের ভোট শেয়ার নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্বাচনে সিপিআই(এম) প্রার্থী ৪০,৬৪৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং কংগ্রেস প্রার্থী আবদুর রাজ্জাক মোল্লা ১০,০৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন।
ভোটের পটভূমি ও মনোনয়ন বিতর্ক
গত ২৯ এপ্রিলের মূল নির্বাচনের সময় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) কালি, আঠা এবং সুগন্ধির মতো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। এর পরিপ্রক্ষিতে নির্বাচন কমিশন কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ২১ মে আসনটির ২৮৫টি ভোটকেন্দ্রেই পুনরায় ভোটের নির্দেশ দেয়। তবে এই নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান দলগতভাবে তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ততক্ষণে মনোনয়ন প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় ইভিএম-এ তাঁর নাম ও প্রতীক রয়ে গিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত শাসক দলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলতার এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ফলাফলকে জনগণের অবাধ ও ভয়হীন ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এতদিন শাসক দল রাজ্য প্রশাসনকে অপব্যবহার করে ভয় দেখানোর রাজনীতি চালাচ্ছিল। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করে তীব্র কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ এখন তৃণমূলকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এই জয়কে ফলতার মানুষের জয় বলে উল্লেখ করে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদী এই জয়কে বাংলার নীতির প্রতি জনগণের অটল আস্থার প্রতিফলন বলে দাবি করেছেন, যা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে বিজেপিকে আরও বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে।