লিভ ইন করলেই দিতে হবে হাজিরা, বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এলে কতটা ওলটপালট হবে চেনা জীবন!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার রাজ্যজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি (UCC) লাগু হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মেনেই এগোচ্ছে নতুন সরকার। ইতিমধ্যে প্রতিবেশী রাজ্য আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ১৫৪ পাতার দীর্ঘ ইউসিসি বিল বিধানসভায় পেশ করেছে। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর আসামের এই পদক্ষেপের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলায় এই আইন কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কী কী বড় বদল আসতে চলেছে?
লিভ ইনে আইনি নজরদারি ও বহু বিবাহে রাশ
বাংলার বুকে এই আইন লাগু হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসতে চলেছে আধুনিক জীবনযাত্রার ওপর। এতদিন তরুণ-তরুণীরা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী লিভ ইন রিলেশন বা সহবাস করতে পারতেন। কিন্তু নতুন বিধি অনুযায়ী, লিভ ইন সম্পর্কে থাকতে গেলে নির্দিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে সম্পর্কের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তকরণ বা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এমনকি রাজ্যের কোনো বাসিন্দা যদি রাজ্যের বাইরে গিয়েও লিভ ইনে থাকেন, তাহলেও তাঁদের এই নিয়ম মানতে হবে। নিয়ম অমান্য করলে থাকছে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান।
পাশাপাশি, বিবাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন আসছে। নতুন নিয়মে বহু বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হতে চলেছে। পরিষ্কার জানানো হয়েছে, বিয়ের সময় স্বামী বা স্ত্রী—কোনো পক্ষেরই পূর্ববর্তী কোনো বৈধ জীবনসঙ্গী জীবিত থাকা চলবে না। আইন অনুযায়ী, পাত্রের বয়স ২১ এবং পাত্রীর বয়স ১৮ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক।
বিবাহবিচ্ছেদ ও সম্পত্তিতে লিঙ্গসমতা
নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, শুধু বিয়েই নয়, বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম আসছে। বিয়ে বা ডিভোর্স হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে তার আইনি রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। এর ফলে সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াকরণ সুনির্দিষ্ট হবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসতে চলেছে উত্তরাধিকার বা সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে। কোনো ব্যক্তি যদি উইল বা ভবিষ্যৎ দানপত্র না করে মারা যান, তবে তাঁর সম্পত্তি বণ্টন হবে সম্পূর্ণ লিঙ্গসমতার ভিত্তিতে। মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মা প্রত্যেকেই সমান আইনি গুরুত্ব পাবেন। ফলে নারীদের সম্পত্তির অধিকার আরও সুরক্ষিত হবে।
আইনের উৎস ও সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব
মূলত পারিবারিক আইন ও সামাজিক রীতিনীতিকে এক ছাতার তলায় এনে আইনি একতা তৈরি করতেই এই বিল আনা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই আইনের ফলে একদিকে যেমন বহু বিবাহের মতো প্রথা বন্ধ হবে এবং নারীদের আইনি অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, অন্যদিকে লিভ ইনের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নজরদারি নিয়ে তৈরি হতে পারে বিতর্ক। তবে উত্তর-পূর্বের রাজ্যের মতো এ রাজ্যেও আদিবাসী বা তফসিলি জনজাতিদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হতে পারে। সব মিলিয়ে, বাংলায় ইউসিসি কার্যকর হলে তা সামাজিক ও আইনি ক্ষেত্রে এক বিশাল বড় রূপান্তর ঘটাবে।