‘ভোটার তালিকায় নাম বাদ মানেই বিদেশি নয়’! সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নতুন মোড়, উঠছে সামাজিক প্রকল্পের প্রশ্ন

নয়াদিল্লি ও কলকাতা: ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে চলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং সাংবিধানিক। তবে একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ— ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া মানেই কোনো ব্যক্তিকে ‘বিদেশি’ বা অ-নাগরিক বলে দেওয়া যাবে না। সেই একচ্ছত্র অধিকার বা ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পরই পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত সরকারের কিছু নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিরোধী শিবির।
নাগরিকত্ব কাড়ার ক্ষমতা কমিশনের নেই, জানাল শীর্ষ আদালত
দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চের স্বাক্ষর করা ১২৪ পাতার দীর্ঘ রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “ভোটার তালিকায় নাম না থাকা আর ভারতের নাগরিক না হওয়া— দুটি এক বিষয় নয়।” আদালত জানিয়েছে, নাগরিকত্ব বিচারের চূড়ান্ত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত নয়, এটি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো যোগ্য কর্তৃপক্ষের। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, যাদের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় নেই, সেই তালিকা আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন মোতাবেক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক) কাছে পাঠাতে হবে। এরপর সেই কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট রাজ্যে পরবর্তী যেকোনো নির্বাচনের আগেই বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে এবং উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে তাঁরা পুনরায় নাম তোলার আবেদন করতে পারবেন।
রাজ্য সরকারের ‘প্রকল্প বন্ধের’ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংঘাত
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মূলত বিহারের একটি মামলার প্রেক্ষিতে হলেও, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছিল যে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে কিংবা যাঁরা এই মুহূর্তে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরা ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ বা অন্যান্য সরকারি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘বেআইনি’ ও ‘অমানবিক’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে বিরোধী দলগুলি।
ভোটে প্রভাব ও বিরোধীদের সুর চড়ানোর চেষ্টা
এই রায়কে হাতিয়ার করে তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ সৌগত রায় তীব্র আক্রমণ শাণিয়ে বলেন, “রাজ্য সরকারের এই নির্দেশ অনৈতিক। সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেখানে বলছে ভোটার তালিকায় নাম বাদ মানেই কেউ বিদেশি নয়, সেখানে রাজ্য সরকার কীভাবে গরিব মানুষের সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে পারে?” তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিহার বা বাংলা— সব জায়গাতেই তাড়াহুড়ো করে লক্ষাধিক নাম বাদ দিয়ে ভোটের আগে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ৩১টি আসনে এসআইআর-এ বাদ পড়া নামের সংখ্যার চেয়ে জয়ের মার্জিন কম ছিল, ফলে এই মানুষরা ভোট দিতে পারলে নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।
অনুরূপ সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ তথা বিশিষ্ট আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভির গলাতেও। তিনি মন্তব্য করেন, “আদালত স্পষ্ট করেছে নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা কমিশনের নেই। অথচ নাগরিক নয়, এই তকমা দিয়েই ভোটার তালিকা থেকে নাম ছাঁটা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই নাম পুনরায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।” সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর একদিকে যেমন এসআইআর প্রক্রিয়া আইনি স্বীকৃতি পেল, অন্যদিকে তেমনই বাদ পড়া নাগরিকদের সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা বজায় রাখা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হলো।