‘অন্নপূর্ণা যোজনা’তে বাদ পড়ছে ৩০ লক্ষ নাম! ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ থেকে ‘রাকিবুল শেখ’ বাদ যাওয়ার উদাহরণ দিলেন শুভেন্দু

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পূর্ববর্তী সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের তালিকায় থাকা মৃত, ভুয়ো, অভারতীয় এবং অস্তিত্বহীন প্রায় ৩০ লক্ষ উপভোক্তাকে বাদ দিয়ে রাজ্যে চালু হতে চলেছে নতুন ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। তবে স্ক্রুটিনির পর এই বাতিল নামের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মঙ্গলবার নবান্নে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ১২ পাতার দীর্ঘ আবেদনপত্র (Form) প্রকাশ এবং অনলাইন পোর্টাল চালুর ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্বচ্ছতা বজায় রেখে শুধুমাত্র প্রকৃত যোগ্যদের হাতেই প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা পৌঁছে দিতে রাজ্য যে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তা স্পষ্ট করে দেন তিনি।
‘রাকিবুল শেখ’দের মতো ভুয়োদের চিহ্নিতকরণের উদাহরণ
এদিন সমাজকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল সহ উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও বিডিওদের নিয়ে এক হাইপ্রোফাইল বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠক শেষে ক্ষোভপ্রকাশ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রাপকদের তালিকাটা অন্তত পরীক্ষিত। কিন্তু খতিয়ে দেখতে গিয়ে কী দেখলাম? মহিলাদের জন্য প্রকল্প হলেও সেখানে বহরমপুরের রাধারঘাটের শিয়ালমারা এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল শেখ (পিতা মনসুর শেখ, এপিক নম্বর SAF1242254) নামের পুরুষও সুবিধা পেয়ে এসেছেন! এটা তো স্রেফ একটা উদাহরণ। এমন ভূরি ভূরি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে।”
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম স্থায়ীভাবে বাদ গিয়েছে, কিংবা যাঁরা ‘এসআইআর’ (SIR) ট্রাইব্যুনালে বা সিএএ (CAA)-তে আবেদন করেননি এবং যাঁরা মৃত বা অস্তিত্বহীন— এমন অন্তত ৩০ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা প্রাথমিক যাচাইয়ে ধরা পড়েছেন। তাঁদের প্রত্যেককে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
১২ পাতার ফর্ম ও ফ্যামিলি ডেটা সংগ্রহ
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সমস্ত পুরনো প্রাপক এবং নতুন আবেদনকারী— উভয়কেই অনলাইন বা অফলাইনে নতুন করে আবেদন করতে হবে। এই ১২ পাতার আবেদনপত্রের ফরম্যাটে উপভোক্তার পাশাপাশি তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর সহ একাধিক জরুরি তথ্য চাওয়া হয়েছে। মূলত এই পারিবারিক তথ্য বা ‘ফ্যামিলি ডেটা’ ব্যবহার করে পরিবারগুলিকে কেন্দ্র এবং রাজ্যের অন্যান্য জনকল্যাণমুখী প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে নতুন সরকার। এছাড়া, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া বা ভোটাধিকার ট্রাইব্যুনালে মামলা বিচারাধীন থাকা নাগরিকদের জন্য ফর্মে তথ্য দেওয়ার বিশেষ কলাম রাখা হয়েছে।
লাইন দেওয়ার দরকার নেই, আবেদন চলবে ৯০ দিন
যোগ্য উপভোক্তাদের আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, “আগামী ২ জুনের মধ্যে যাঁদের আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যাবে, ৩ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরই তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকা ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) করা হবে। তবে এই স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া যতদিন না শেষ হবে, ততদিন পুরনো প্রাপকেরা আগের মতোই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেতে থাকবেন। তাই তাড়াহুড়ো করে ব্যাঙ্কে বা সরকারি অফিসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”
আজ বৃহস্পতিবার থেকেই রাজ্য জুড়ে এই আবেদন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু হচ্ছে, যা আগামী ৯০ দিন ধরে চলবে। এর মধ্যে প্রথম ৩০ দিন ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ দিয়ে সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণ করাবেন। এছাড়া, আগামী ১৫, ১৬ এবং ১৭ মে’র প্রস্তাবিত রাজ্যব্যাপী জনকল্যাণ শিবিরেও এই আবেদনপত্র জমা নেওয়া হবে। এই কাজে স্থানীয় বিডিও, পুর ও পঞ্চায়েত কর্মীদের পাশাপাশি বিধায়কদেরও বিশেষ তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার থেকে সরকারি বাসে নারীদের বিনামূল্যে সফর
অন্নপূর্ণা যোজনার পাশাপাশি এদিন রাজ্যের মহিলাদের জন্য আরও এক বড় উপহার দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ঘোষণা করেন, আগামী সোমবার থেকেই রাজ্যের সমস্ত সরকারি বাসে মহিলারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে সাধারণ নিয়মে এই সুবিধা মিললেও পরবর্তীতে যাতায়াতের জন্য মহিলাদের বিশেষ ‘স্মার্ট কার্ড’ দেওয়া হবে সরকারের তরফ থেকে। নতুন সরকারের এই জোড়া ঘোষণায় স্বভাবতই রাজ্য জুড়ে খুশির হাওয়া মহিলাদের মধ্যে।