বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৩০০ বছরের প্রাচীন সুড়ঙ্গ অট্টালিকা! প্রশাসনের দ্বারস্থ ইয়াসিন পাঠান

সংবাদদাতা, খড়্গপুর: ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী মন্দিরময় পাথরায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও বেদনায় গর্জে উঠেছেন পাথরা এলাকার মন্দির সংরক্ষণের প্রাণপুরুষ ইয়াসিন পাঠান। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে পাথরার প্রাচীন ‘সুড়ঙ্গ অট্টালিকা’ সম্পূর্ণ দুরমুশ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই হেরিটেজ ধ্বংসের ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনি জেলা প্রশাসন এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (ASI) দ্বারস্থ হয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেদিনীপুর শহরের অদূরে পাথরা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মন্দির রক্ষায় ৫০ বছর, সম্প্রীতির দূত ইয়াসিন
মেদিনীপুর তথা গোটা রাজ্যবাসীর কাছে মন্দিরময় পাথরা এবং ইয়াসিন পাঠান— এই দুটি নাম যেন একে অপরের সমার্থক। বিগত ৫০ বছর ধরে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে পাথরার শতাব্দী-প্রাচীন ৩৪টি হিন্দু মন্দিরকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন ‘ইয়াসিন ভাই’। গ্রামীণ বাংলার বুকে এই অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্য রক্ষার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে তিনি লাভ করেছেন দেশের সম্মানজনক ‘কবীর পুরস্কার’। সেই ইয়াসিন সাহেবই এবার গুরুতর অসুস্থ শরীর নিয়েও সুপ্রাচীন স্থাপত্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামলেন।
নির্বাচনের সুযোগে ক্ষমতার আস্ফালন! কাঠগড়ায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী
স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, টেরাকোটায় অলংকৃত পাথরার বহু শতাব্দী-প্রাচীন মন্দির আগেই কংসাবতী নদীর করাল গ্রাসে তলিয়ে গিয়েছে। প্রায় ৫০ বছর আগে ‘পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি’ গড়ে তুলে ৪২টি মন্দিরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন ইয়াসিন পাঠান। যার মধ্যে ৩৪টি মন্দির বর্তমানে এএসআই-এর অধীনে সংরক্ষিত। এই নবরত্ন মন্দির, কাছারি মহল, রাসমঞ্চ, কালাচাঁদের দালান, দুর্গেশ্বর মন্দির ও পঞ্চ শিবমন্দিরের টানেই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা পাথরায় ছুটে আসেন।
আর এই চত্বরেই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের জমিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল একটি সুড়ঙ্গ যুক্ত সুপ্রাচীন অট্টালিকা। মাস ছয়েক আগে মেদিনীপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের থেকে সেই জমিটি কিনে নেন ভবানীনগরের বাসিন্দা তথা এক নামী স্বর্ণ ব্যবসায়ী লালু পাল। ইয়াসিন সাহেবের অভিযোগ, “জায়গাটি রায়ত (ব্যক্তিগত) সম্পত্তি হলেও দেশের প্রাচীন স্থাপত্য আইন অনুযায়ী এইভাবে তা ধ্বংস করা যায় না। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অট্টালিকাটি অক্ষত ছিল। এরপরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ব্যস্ততা এবং প্রশাসনিক টালবাহানার সুযোগ নিয়ে রাতারাতি বুলডোজার নামিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।”
মাটির নিচে এখনও রয়েছে সুড়ঙ্গ, পুনর্নির্মাণের দাবি
এই বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী লালু পাল নিজের দায় এড়াতে সাফাই দিয়ে বলেন, “বাড়িটি ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়েছিল। আমি এর ইতিহাস না জেনেই সমতল করার কাজ করেছি।” যদিও ব্যবসায়ীর এই যুক্তি মানতে নারাজ হেরিটেজপ্রেমীরা। ইয়াসিন সাহেবের দাবি, ওপরের অংশ সমতল করা হলেও মাটির নিচে এখনও সেই প্রাচীন সুড়ঙ্গ অক্ষত রয়েছে। তাই প্রশাসন যদি দ্রুত উদ্যোগ নেয়, তবে ওই প্রাচীন ইঁটগুলি সংগ্রহ করে চুন ও সুরকি দিয়ে পুনরায় এই ঐতিহাসিক অট্টালিকা গড়ে তোলা সম্ভব। জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক এই ঘটনাকে অত্যন্ত ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।