‘বাংলাদেশ বাজে দেশ, ভারতেই থাকতে চাই’! জেরায় কাতর আর্জি ধৃত অনুপ্রবেশকারী তাহিদুলের

কৃষ্ণনগর: “ভারত খুব ভালো দেশ। আমি আর ওপারে ফিরে যেতে চাই না, দয়া করে আমাকে এখানেই থাকতে দিন।”— পুলিশি হেফাজতের জেরা চলাকালীন তদন্তকারী আধিকারিকদের কাছে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়ে কাতর আবদার জানাল ধৃত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। এ দেশে ভুয়ো নথির জোরে তার পরিচয় হয়েছিল ‘সুমন শেখ’। কিন্তু ওপার বাংলায় তার আসল নাম মহম্মদ তহিদুল ইসলাম। সম্প্রতি নদীয়ার পলাশিপাড়া থানার পুলিশের বিশেষ তৎপরতায় ধরা পড়েছে এই বাংলাদেশি যুবক। তাকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করে এ রাজ্যে অবৈধ ভারতীয় নথিপত্র তৈরির চক্রের শিকড়ে পৌঁছাতে চাইছেন জেলা গোয়েন্দারা।
চোরাপথে ভারতে ঢুকে মুম্বই পাড়ি, ‘তহিদুল’ থেকে ‘সুমন’ হওয়ার গল্প
পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, সালটা ছিল ২০১৭। নদীয়া জেলার তেহট্ট সীমান্তের একটা বড় অংশে তখনও পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তেহট্টের বেতাই সীমান্ত দিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে চোরাপথে ভারতে প্রবেশ করে বাংলাদেশের মেহেরপুরের বাসিন্দা মহম্মদ তহিদুল ইসলাম। তার দাবি, ছোটবেলা থেকেই তার ভারতকে খুব ভালো লাগত এবং বাংলাদেশের ‘খারাপ’ পরিস্থিতি থেকে সে চিরতরে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল।
ভারতে ঢোকার পর শুরুর দিকে সে নদীয়ায় স্থায়ীভাবে থাকেনি। আইনি নজরদারি এড়াতে সে সরাসরি চলে যায় মুম্বইয়ে। সেখানে দীর্ঘদিন নির্মাণ শ্রমিকের (রাজমিস্ত্রি) কাজ করার সুবাদে স্থানীয় দালাল চক্রের সাহায্যে একটি ভুয়ো পাসপোর্ট বানিয়ে ফেলে সে। পাসপোর্টের সঙ্গেই জুটে যায় সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয়— ‘সুমন শেখ’। এরপর সেই পাসপোর্টের সূত্র ধরে আধার কার্ড ও প্যান কার্ড সহ ভারতের অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে তার খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।
বাংলাদেশের ভিসা নিয়ে এ দেশেই মশলার ব্যবসা!
মুম্বইয়ে পরিচয় বদল করার পর ২০২৪ সালে ফের নদীয়া জেলায় ফিরে আসে তহিদুল ওরফে সুমন। পলাশিপাড়া থানার পলসুণ্ডা এলাকায় এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করে সে। এরপরই শুরু হয় তার আসল জালিয়াতি। নদীয়ার ওই আস্তানা থেকেই বাংলাদেশের অফিশিয়াল ভিসা ব্যবহার করে এ দেশে এলাচ সহ বিভিন্ন দামি মশলাপাতির ব্যবসা ফেঁদে বসে সে। দীর্ঘদিন ধরেই সে রমরমিয়ে এই ব্যবসা চালাচ্ছিল।
পুলিশকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা, শেষরক্ষা হলো না
সম্প্রতি গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পলসুণ্ডা এলাকার সেই ডেরায় আচমকা অভিযান চালায় পলাশিপাড়া থানার পুলিশ। সেখান থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমদিকে তার কাছে থাকা নিখুঁত ভারতীয় নথিপত্র দেখে পুলিশের পক্ষেও তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রমাণ করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক স্তরে গভীর তদন্ত ও ওপার বাংলার সীমান্ত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের পর জানা যায়, বাংলাদেশের ভোটার তালিকাতেও তার নাম ও ছবি হুবহু রয়েছে। এরপরই তদন্তকারীদের সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হয়।
তদন্তে জেলা পুলিশ, ভীমপুরে তৈরি ‘হোল্ডিং সেন্টার’
জেলা পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, ধৃত সুমন ওরফে তহিদুলকে কড়া হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ রাজ্যের কোন কোন প্রভাবশালী দালাল তাকে এই ভুয়ো পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র বানাতে সাহায্য করেছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তার মাধ্যমে আরও কতজন অনুপ্রবেশকারী নদীয়া ও মুম্বইয়ে ছড়িয়ে রয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের কড়াকড়ির জেরে সম্প্রতি নদীয়ারই ভীমপুর থানা এলাকাতেও আরও এক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর হদিশ পেয়েছে পুলিশ। সমস্ত নথিপত্র জাল প্রমাণিত হওয়ায় নতুন সরকারের নিয়ম মেনে তাকে আপাতত ভীমপুর এলাকার নবনির্মিত ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে।