হৃদয়ের টানে মায়াপুরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, সব লাঞ্ছনা সহ্য করেও ইসকনের সন্ন্যাসীরা বন্দনীয়!

মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর এই প্রথমবার নদিয়ার মায়াপুরের ইসকন মন্দিরে এলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গীতার অমোঘ বাণীকে পাথেয় করে আগামী দিনে যাতে বাংলার মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারেন এবং রাজ্যের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়— রাধামাধবের চরণে ঠিক এই প্রার্থনাই জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার মায়াপুরের ইসকন মন্দিরে এসে একগুচ্ছ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মায়াপুরে আসার তীব্র ইচ্ছা ছিল তাঁর।
মায়াপুরে দিনভর ভক্তি ও আচার
মায়াপুরে মুখ্যমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, যাতে সশরীরে অংশ নেন তিনি। এর পর তিনি সরাসরি চলে যান ইসকনের গোশালায়। সেখানে সন্ন্যাসীদের উপস্থিতিতে বিশেষ পুজো ও ‘গো-সেবা’ করেন। পরম যত্নে জল দিয়ে গোমাতার পা ধুইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিজ হাতে খাবারও খাওয়ান তিনি। গোশালার পর্ব চুকিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রবেশ করেন ইসকনের মূল আকর্ষণ চন্দ্রোদয় মন্দিরে। সেখানে রাধামাধবের বিগ্রহ দর্শন করে পুজো ও আরতিতে অংশ নেন তিনি। আরতি শেষে বিগ্রহের সামনে মেঝেতে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে দেখা যায় তাঁকে। মন্দির চত্বরে উপস্থিত সাধারণ ভক্তদের মাঝে মিশে গিয়ে এদিন এক অন্য মেজাজে ধরা দেন মুখ্যমন্ত্রী। অনেককে জড়িয়ে ধরে ও হাত মিলিয়ে সকলের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের মন্দিরে গিয়েও পুজো দেন এবং সেখানেও প্রভুপাদের বিগ্রহের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানান।
সন্ন্যাসীদের বন্দনা ও সনাতনী আবেগ
পুজো ও দর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি কালীঘাট, বেলুড় মঠ, জৈন মন্দির ও লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরে গিয়েছি। তবে মায়াপুরের ইসকনে এসে রাধামাধবের দর্শন করা, গোমাতার সেবা করা, মহাপ্রভু চৈতন্যদেবকে স্মরণ করা এবং কীর্তন-ভজন শোনার একটা বড় ইচ্ছা আমার প্রথম থেকেই ছিল। আজ এখানে আমি রাজনীতিক হিসেবে নয়, নিজের হৃদয়ের টানে এসেছি। আমি একজন সনাতনী এবং ইসকনের ভক্ত।”
ইসকনের সন্ন্যাসীদের নিঃস্বার্থ কাজের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “ইসকনের সন্ন্যাসীরা যেভাবে সমস্ত অপমান এবং লাঞ্ছনা সহ্য করার পরেও থেমে না থেকে নিঃস্বার্থভাবে গীতার বাণী প্রসার ও প্রচার করে চলেছেন, তা সত্যিই বন্দনীয়।” এর পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রতি বছর নিয়ম করে দোলপূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী এবং জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সময়— অর্থাৎ বছরে মোট তিনবার তিনি নিয়ম মেনে রাধামাধবের বিশেষ অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে থাকেন।
ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীর এই মায়াপুর সফর এবং নিজেকে ‘সনাতনী ও ইসকন ভক্ত’ হিসেবে তুলে ধরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে ইসকন এবং সনাতন ধর্মের সন্ন্যাসীদের উপর বিভিন্ন মহলে যে বিতর্ক ও লাঞ্ছনার অভিযোগ উঠেছে, তার প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রীর এই “বন্দনীয়” বার্তা রাজ্যের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, বাংলার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য রাধামাধবের চরণে প্রার্থনা করার মাধ্যমে তিনি রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন, যা আগামী দিনে প্রশাসনের নীতি নির্ধারণ ও জনমানসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।