দলে কিসের এত শ্বাসকষ্ট, তৃণমূলের ‘মুষল পর্বে’ শুদ্ধীকরণের ডাক কুণালের!

দলে কিসের এত শ্বাসকষ্ট, তৃণমূলের ‘মুষল পর্বে’ শুদ্ধীকরণের ডাক কুণালের!

রাজ্যে ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক ক্ষোভ, দলত্যাগের জল্পনা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের আবহে এবার বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। বরাবরই স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত এই নেতা দলের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মুষল পর্ব’ আখ্যা দিয়ে সহকর্মীদের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ স্তাবকতা, সুবিধাবাদ এবং ‘ফ্যান ক্লাব’ সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি একদা ক্ষমতার সুফল ভোগ করা ক্ষুব্ধ নেতাদেরও কড়া ভাষায় বিঁধেছেন। ক্ষমতা বদলাতেই যেসব নেতারা সুর বদলাচ্ছেন, তাঁদের এই আচরণকে ‘দৃষ্টিকটু’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।

কুণাল ঘোষের এই বার্তার পেছনে রয়েছে দলের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া প্রবল অস্থিরতা। এক মাসও হয়নি যাঁরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন কিংবা টিকিট পাওয়ার জন্য লবিং করেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন দলের ভুলত্রুটি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। কুণালের সরাসরি প্রশ্ন, দল যদি এতই খারাপ ছিল, তবে তাঁরা প্রার্থী হলেন কেন? তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, দল ক্ষমতায় থাকলে সবাই আছেন, আর ক্ষমতা না থাকলেই একসঙ্গে এত লোকের ‘শ্বাসকষ্ট’ শুরু হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। মাঠে-ঘাটে এখন সাধারণ কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো নেতার বড়ই অভাব।

বিস্ফোরক অভিযোগ ও আত্মপর্যালোচনার দাবি

দলের সাংগঠনিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে কুণাল অভিযোগ করেছেন যে, তৃণমূলের ভেতর একশ্রেণির সুবিধাবাদী, ফেরেব্বাজ এবং অন্য দল থেকে আসা ধান্দাবাজ লোকজন অতিরিক্ত গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছে। দলে তৈরি হয়েছিল ‘নেতার ফ্যান ক্লাব, সচিবের ফ্যান ক্লাব’ সংস্কৃতি। কুণাল মনে করিয়ে দেন, এই সমস্ত ভুলত্রুটির বিরুদ্ধে অতীতে কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজে একাধিকবার সাসপেন্ড ও সেন্সরড হয়েছেন, অথচ আজকের এই ‘বিপ্লবী’ নেতাদের কেউ তখন তাঁর পাশে দাঁড়াননি। তাঁর দাবি, বিনা দোষে তাঁর চেয়ে বেশি রাজনৈতিক যন্ত্রণা এই দলে কেউ পায়নি, তাই রাগ বা অভিমান করার অধিকার তাঁরই সবচেয়ে বেশি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের চক্রান্তের পাশাপাশি দলেরও কিছু ভুলত্রুটি ছিল, যা নিয়ে আত্মপর্যালোচনা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

শুদ্ধীকরণ ও পুনর্গঠনের বার্তা

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দলকে পুনর্গঠন করতে বেলেঘাটার বিধায়ক ৩টি মূল পথ বাতলে দিয়েছেন। প্রথমত, এই কঠিন সময়ে ঘরে বসে না থেকে আক্রান্ত কর্মীদের পাশে সশরীরে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, দলের সাংগঠনিক কাজ ও জনস্বার্থের কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে কেন্দ্র ও রাজ্যের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, যাবতীয় ভুলত্রুটি নিয়ে দলের অন্দরেই খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটাকে নতুন করে সাজানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত

কুণাল ঘোষের এই ফেসবুক পোস্টের ফলে তৃণমূলের ভেতরের ফাটল ও নেতৃত্ব সংকট আরও প্রকটভাবে জনসমক্ষে চলে এল। এর ফলে দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল যেমন ধাক্কা খেতে পারে, তেমনই ক্ষুব্ধ নেতাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। কুণাল সাফ জানিয়েছেন, স্পষ্ট করে সমস্যা জানানোর পরেও নেতৃত্ব যদি ভুল সংশোধনের পথে না হাঁটেন, তবেই একমাত্র বিকল্প পথ ভাবার সুযোগ থাকবে, তার আগে নয়। নিজেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৈনিক দাবি করে ঐতিহাসিক রূপক টেনে তিনি লিখেছেন, ‘আলেকজান্ডার নাই বা হলাম, পুরুর সম্মানটাই থাক। বাকিটা সময় পথ দেখাবে।’ তাঁর এই বার্তা আগামী দিনে তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় শুদ্ধীকরণ অথবা বড় কোনো রাজনৈতিক রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *