জ্বালানির পর এবার রান্নার তেল, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষের পকেট

জ্বালানির পর এবার রান্নার তেল, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষের পকেট

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি এসে লেগেছে ভারতের আমজনতার হেঁশেলে। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাশুল গুনতে হচ্ছে এ দেশের মধ্যবিত্তকে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, শুধু পেট্রল-ডিজেলের দামই বাড়ছে না, বরং সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীও অগ্নিমূল্য হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার তেলের বাজারে, যেখানে দাম বৃদ্ধির সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাত্র চার মাসে রিফাইন্ড ভোজ্য তেলের মুদ্রাস্ফীতির হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিছিয়ে নেই সরষের তেলও। বর্তমানে বাজারে ক্যাটেগরি এবং প্যাকেট সাইজ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভোজ্য তেল প্রতি লিটার ১১০ টাকা থেকে শুরু করে এক ধাক্কায় ২০৭ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানির চড়া দামের পর রান্নার তেলের এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মূল কারণ বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও হোরমুজ প্রণালীর সংকট

এই অগ্নিমূল্য পরিস্থিতির মূলে রয়েছে বিশ্বব্যাপী জোগান শৃঙ্খল বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেনের বিপর্যয়। বিশেষ করে ‘হোরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) নিয়ে তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনা আন্তর্জাতিক তেল বাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বের সমুদ্রপথের তেল বাণিজ্যের সিংহভাগই এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই স্ট্র্যাটেজিক রুটে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম রকেটের গতিতে ছুটে ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে।

ভারতের মতো দেশ, যারা বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। ভারতীয় টাকার দাম ডলারের তুলনায় ক্রমাগত পড়তে থাকায় তেল আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

সর্বগ্রাসী প্রভাব ও খাদ্যসংকটের আশঙ্কা

রান্নার তেলের এই আগুন শুধু তেলের বোতলেই সীমাবদ্ধ নেই, এর জেরে সামগ্রিক মুদিখানা বিলের খরচ একলাফে অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। প্যাকেটজাত স্ন্যাক্স, বেকারি আইটেম এবং রেডি টু ইট ফুডের উৎপাদন খরচ বাড়ায় নিত্যদিন ব্যবহারের একগুচ্ছ জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে খনিজ তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাজারজুড়ে সবজি থেকে চাল-ডাল, সবকিছুরই দাম এখন আকাশছোঁয়া।

এদিকে, রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের তীব্র সতর্কতা জারি করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সার এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে গোটা বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক কুপ্রভাব ফেলবে। এই আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা— দুই-ই এখন চরম সংকটের মুখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *