ফুটবল মাঠে বিশৃঙ্খলা রুখতে মারমুখী ফিফা, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকেই চালু হচ্ছে একগুচ্ছ কড়া নিয়ম

ফুটবল মাঠে বিশৃঙ্খলা রুখতে মারমুখী ফিফা, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকেই চালু হচ্ছে একগুচ্ছ কড়া নিয়ম

বিশ্বকাপের ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই ফুটবলের নিয়মকানুন আমূল বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা। সময় নষ্ট করা, রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছাড়ার মতো বিতর্কিত আচরণ ঠেকাতে এবং খেলার গতি বাড়াতে একগুচ্ছ কড়া নিয়ম অনুমোদিত হয়েছে। ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আইএফএবি (IFAB) এই পরিবর্তনগুলোর ছাড়পত্র দিয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ মরসুম থেকে এগুলো বিশ্বজুড়ে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে চলেছে প্রথম বড় টুর্নামেন্ট, যেখানে এই নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ দেখা যাবে। ফিফার প্রধান রেফারিং আধিকারিক পিয়নেরলুইজি কলিনার মতে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য বৈষম্য কমানো, সময় নষ্ট রোখা এবং খেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা।

মাঠ ছাড়লেই লাল কার্ড ও মুখ ঢেকে ঝগড়ায় নিষেধাজ্ঞা

আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে পেনাল্টির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেনেগাল দলের মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্ব ফুটবলে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এবার থেকে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কোনও ফুটবলার মাঠ ছাড়লে তিনি সরাসরি লাল কার্ড দেখবেন। কোনও কোচ বা টিম অফিসিয়াল এই কাজে উসকানি দিলে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি কোনও দলের অবাধ্যতায় ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে প্রতিপক্ষকে সরাসরি জয়ী ঘোষণা করা হবে।

পাশাপাশি, মাঠে ফুটবলারদের মুখ ঢেকে কথা বলার প্রবণতার ওপর জারি হয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কোনও মন্তব্য করলে ফুটবলারকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হতে পারে। রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানিকে কেন্দ্র করে অতীতে তৈরি হওয়া বর্ণবিদ্বেষের বিতর্ক মাথায় রেখেই এই নিয়ম আনা হয়েছে। কলিনার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় মুখ ঢেকে কথা বলার অর্থই হলো সেখানে কোনও গোপন বা অনুচিত বিষয় ঘটছে, যা আর বরদাস্ত করা হবে না।

সময় নষ্ট রুখতে ঘড়ির কাঁটায় নজর

ম্যাচের গতি ধরে রাখতে থ্রো-ইন এবং গোলকিকের ক্ষেত্রে সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। রেফারি সংকেত দেওয়ার পর পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে থ্রো না নিলে বলের দখল চলে যাবে প্রতিপক্ষের কাছে। একইভাবে গোলকিক নিতে দেরি হলে প্রতিপক্ষ দল কর্নার কিক উপহার পাবে।

খেলোয়াড় বদলির ক্ষেত্রেও গতি আনা হচ্ছে। পরিবর্তনের বোর্ড ওঠার পর সংশ্লিষ্ট ফুটবলারকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে। ব্যর্থ হলে পরিবর্ত খেলোয়াড় মাঠে নামার অনুমতি পাবেন না এবং ওই দলকে নির্দিষ্ট সময় ১০ জনে খেলতে হবে। এছাড়া মাঠে চিকিৎসার সুবিধো নিয়ে সময় নষ্ট বন্ধ করতে নতুন নিয়ম করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে খেলা শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ফুটবলারকে অন্তত এক মিনিট মাঠের বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। তবে গোলরক্ষক, মাথায় আঘাত বা গুরুতর চোটের ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় থাকবে।

ভিএআর প্রযুক্তির পরিধি বৃদ্ধি

আগামী বিশ্বকাপ থেকে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR)-এর ক্ষমতা ও পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে। ভুল পরিচয়ে কার্ড দেখানো, ত্রুটিপূর্ণ দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে লাল কার্ড দেওয়া কিংবা কর্নারের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ভুল থাকলে এখন থেকে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, কর্নার বা ফ্রি-কিক নেওয়ার ঠিক আগে আক্রমণকারী দলের কোনও ফুটবলার ফাউল করলে সেটিও খতিয়ে দেখে গোল বাতিল করার ক্ষমতা থাকবে ভিএআর-এর হাতে।

এই সংস্কারের ফলে ফুটবল মাঠের চেনা সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাবে। সময় নষ্ট ও অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে ফিফার এই কড়া বার্তা আগামী দিনে খেলাটিকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও গতিশীল করে তুলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *