মহারাষ্ট্রের ছায়া বাংলায়, তবে শিন্ডে মডেলের সাথে তৃণমূলের ভাঙনের অমিল কোথায়

মহারাষ্ট্রের ছায়া বাংলায়, তবে শিন্ডে মডেলের সাথে তৃণমূলের ভাঙনের অমিল কোথায়

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের মাত্র এক মাসের মধ্যে রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ওলটপালট ঘটে গিয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পরেই কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, যার ফলে দলীয় রাশ সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বর্তমানে তৃণমূলের বিদ্রোহী ৫৮ জন বিধায়কের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একদা বাম ছাত্রনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে। এই আকস্মিক ভাঙনের পর রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই মহারাষ্ট্রের সেই বহুচর্চিত ‘শিন্ডে মডেলের’ তত্ত্ব উঠে আসছে, যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আদর্শগত ক্ষোভ বনাম অস্তিত্বের লড়াই

মহারাষ্ট্রে ২০২২ সালের জুন মাসে যখন শিবসেনা ভেঙেছিল, তখন রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল শিবসেনা, এনসিপি ও কংগ্রেসের ‘মহাবিকাশ আঘাড়ি’ জোট। শিবসেনার তৎকালীন ভাঙনের মূল কারণ ছিল আদর্শগত বিচ্যুতি ও দলের অন্দরের ক্ষোভ। কট্টর হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ছেড়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুই দলের সাথে জোট করার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি একনাথ শিন্ডেসহ বহু বিধায়ক। বিজেপি সেই সময় শিবসেনার কট্টর হিন্দুত্ববাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে এবং উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে হাতিয়ার করে নিখুঁত আইনি ও রাজনৈতিক চালে সরকার পতন ঘটিয়েছিল।

বাংলায় সমীকরণের ভিন্নতা ও সম্ভাব্য প্রভাব

তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মহারাষ্ট্রের সেই মডেলের বড় পার্থক্য হলো ক্ষমতার সমীকরণে। মহারাষ্ট্রে বিজেপি বিরোধী আসনে বসে সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে শিবসেনায় ভাঙন ধরিয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিজেপি ইতিমধ্যেই ২০৯টি আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে ফেলেছে। ফলে রাজ্যে নতুন করে সরকার গড়ার বা টিকিয়ে রাখার জন্য তৃণমূলকে ভাঙার কোনো গাণিতিক প্রয়োজন বিজেপির নেই।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ভাঙনের নেপথ্যে রয়েছে ভিন্ন এক কৌশলগত কারণ। বিজেপি চাইছে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন লড়াকু নেত্রীর দল বিধানসভায় প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে থাকুক। বরং তারা এমন এক দুর্বল ও নমনীয় বিরোধী দল চাইছে যা তাদের পক্ষে সামলানো সহজ হবে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এই ‘নতুন তৃণমূল’ আদতে শাসক দলের জন্য একপ্রকার রাজনৈতিক স্বস্তি তৈরি করতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে, যার প্রভাব আগামী দিনে রাজ্যের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা ও বিরোধী রাজনীতির অভিমুখ নির্ধারণ করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *