কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় গৃহবধূকে শ্বাসরোধে খুন, ৯ বছর পর স্বামীসহ ৪ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড!

কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে এক গৃহবধূকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে বনগাঁ আদালত। প্রায় নয় বছরের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃত গৃহবধূর স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি এবং দেওরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। বিচারক মৃত্যুঞ্জয় কর্মকার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ১৩ জন সাক্ষীর বয়ান এবং পেশ করা সমস্ত তথ্যপ্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে এই কঠোর সাজা ঘোষণা করেন। আদালতের এই রায় সমাজে নারী নির্যাতন ও কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি কঠোর আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, উত্তর চব্বিশ পরগনার গোপালনগর থানার কামদেবপুরের বাসিন্দা ও পেশায় গ্যারেজ মিস্ত্রি তারক কর্মকারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল পিংকি কর্মকারের। বিয়ের পর থেকেই পিংকির ওপর পণের দাবিতে লাগাতার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ। বিয়ের আড়াই বছর পর পিংকি অন্তঃসত্ত্বা হলে শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা একটি পুত্রসন্তানের আশা করেছিলেন। কিন্তু পিংকি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ায় সেই অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। সন্তান জন্মের মাত্র তিন মাস পরেই, ২০১৭ সালের ১৪ মে রাতে পিংকিকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। পরদিন সকালে বাপের বাড়ির লোকজনকে পিংকির অসুস্থতার মিথ্যা খবর দেওয়া হলেও হাসপাতালে গিয়ে তাঁরা মর্গে পিংকির মৃতদেহ দেখতে পান। এরপরই গোপালনগর থানায় খুনের লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
যৌতুক প্রথা ও কন্যাসন্তান নিয়ে অন্ধ মানসিকতার প্রতিফলন
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বিশ্লেষণ করলে দুটি প্রধান সামাজিক ব্যাধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রথমত, অন্যায় পণের দাবি এবং দ্বিতীয়ত, পুত্রসন্তানের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও কন্যাসন্তানের প্রতি চরম অবহেলা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সমাজের একটি অংশে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এই অন্ধকার মানসিকতাই পিংকির অকাল মৃত্যুর কারণ। পুত্রসন্তান না হওয়ায় এবং বাপের বাড়ি থেকে বাড়তি টাকা না আনায় একজন নারীকে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই প্রবণতা সামাজিক অবক্ষয়েরই চরম বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার ও সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব
২০১৭ সালের এই ঘটনার চূড়ান্ত রায় আসতে দীর্ঘ ৯ বছর সময় লেগেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এই সাজা ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। এই রায়ের ফলে সমাজে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আইন যে অপরাধীদের ছাড় দেয় না এবং কন্যাসন্তান বা পণের কারণে নারীদের ওপর নির্যাতন চালালে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই রায় তা প্রমাণ করল। এটি ভবিষ্যতে এই ধরনের পারিবারিক অপরাধ এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।