স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি শিশুদের ভবিষ্যৎ! মারাত্মক ক্ষতির মুখে মস্তিষ্কের বিকাশ

শিশুদের জন্মের পর থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড’। এটি মূলত শিশুর মস্তিষ্কের বুনিয়াদ গঠনের সোনালি সময়, যখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ লক্ষ নিউরন সংযোগ তৈরি হয়। ভাষা শেখা থেকে শুরু করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক যোগাযোগের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো শিশু এই সময়েই আয়ত্ত করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই অমূল্য সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছে স্মার্টফোনের মোহময় পর্দা, যার ফলে শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মস্তিষ্কের বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব
স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের মনোযোগের চরম ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যাকে চিকিৎসকরা ‘ডিজিটাল এডিএইচডি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ছোট ছোট ভিডিও বা রিলসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বই পড়া বা ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পাশাপাশি, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন কমে যাওয়ায় শিশুদের ভাষা শেখার প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং শব্দভাণ্ডার সংকুচিত হচ্ছে। স্ক্রিনের কার্টুন থেকে মানবিক আবেগ বা সহানুভূতি শেখা সম্ভব নয় বলে শিশুরা ক্রমশ আবেগহীন হয়ে পড়ছে এবং সামান্যতেই রাগান্বিত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া স্ক্রিনের নীল আলোর প্রভাবে ঘুমের ব্যাঘাত, চোখের শুষ্কতা এবং মাথাব্যথার মতো শারীরিক উপসর্গও ছোটবেলা থেকেই প্রকট হচ্ছে। বাস্তব জগতের শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধ থেকে দূরে সরে গিয়ে শিশুর মস্তিষ্ক কেবল একটি ছয় ইঞ্চির স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও সমাধানের উপায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো ধরনের স্ক্রিন টাইম থাকা একেবারেই উচিত নয়। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা-ও বাবা-মায়ের সতর্ক উপস্থিতিতে। শিশু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সন্তানকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতের জন্য মনোযোগহীনতা, ক্ষোভ ও বিষণ্ণতার মতো সমস্যাগুলোকে ডেকে আনা। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বদলে সৃজনশীল খেলাধুলা, মাটি, রং বা গল্পের বইয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন। খাবার টেবিল বা শোবার ঘরের মতো স্থানগুলোকে ‘নো ফোন জোন’ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি, প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট স্মার্টফোন দূরে সরিয়ে রেখে সন্তানের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।