ক্ষমতা যেতেই ‘সাত খুন মাফ’-এর ম্যাজিক শেষ! সরকার বদলাতেই উধাও ১৫ বছরের ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’

ক্ষমতা যেতেই ‘সাত খুন মাফ’-এর ম্যাজিক শেষ! সরকার বদলাতেই উধাও ১৫ বছরের ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’

কলকাতা: চার চাকা গাড়ির ড্যাশবোর্ডে সারি সারি ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ রাখা থাকলেই রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের হাত তোলার সাধ্য ছিল না—গত ১৫ বছর ধরে এটাই ছিল পশ্চিমবঙ্গের চেনা ছবি। কিন্তু গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশ এবং রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে বড়সড় ওলটপালট ঘটতেই বদলে গেল সেই চিরপরিচিত দৃশ্য। রাতারাতি তৃণমূলের ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের গাড়ির ড্যাশবোর্ড এখন একেবারে ‘ক্লিন’। উধাও সেই প্রভাব খাটানোর অলিখিত লাইসেন্স।

কী এই ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ কালচার?

২০১১ সালে বামফ্রন্টকে হারিয়ে তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গাড়ির ড্যাশবোর্ডে এই ব্যাজ রাখার চল শুরু হয়। অভিযোগ, এই ব্যাজ গাড়িতে থাকা মানেই রাস্তায় ট্রাফিক আইন ভাঙা থেকে শুরু করে পুলিশের চেকিং—সব কিছু থেকেই অনায়াসে পার পেয়ে যাওয়া যেত। রাজ্য সড়ক হোক বা জাতীয় সড়ক, পুলিশের ঝক্কি এড়াতে দলের নেতা তো বটেই, বহু সাধারণ মানুষও বাজার থেকে এই ব্যাজ কিনে গাড়িতে রেখে প্রভাব খাটাতেন।

কী বলছেন তৃণমূল নেতারা?

বিষয়টি নিয়ে ভাটপাড়া শহরের তৃণমূল সভাপতি দেবজ্যোতি ঘোষ স্পষ্টই জানান, “তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এই চল শুরু হয়েছিল। ব্যাজ থাকলে পুলিশ গাড়ি আটকানোর সাহস দেখাত না। তবে দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে এমন কোনও অলিখিত নির্দেশ দেওয়া ছিল না। এখন তো বিজেপির আমলেও গেরুয়া কাপড় রাখার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে।” অন্যদিকে, বাঁকুড়া জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ অর্চিতা বিদের দাবি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাওয়া ব্যাজ তাঁরা গাড়িতে রাখতেন, তবে পুলিশের কাছ থেকে কোনও বাড়তি সুবিধা নেওয়ার জন্য নয়।

জনতার তাড়া আর ডিমের ভয়েই কি এই লুকোচুরি?

রাজ্যে সরকার বদলের পর থেকেই দুর্নীতি ইস্যুতে কোণঠাসা ঘাসফুল শিবির। রাস্তায় বেরোলেই তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে উঠছে ‘চোর চোর’ স্লোগান, ছোঁড়া হচ্ছে ডিম। এমনকি খোদ দলের শীর্ষ নেতৃত্বও এই জনরোষের মুখে পড়েছেন। কৃষ্ণনগরে প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের বাড়িতে ঢুকে ডিম ছোঁড়ার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চরম ডামাডোলের বাজারে গাড়িতে ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ রেখে নিজেদের তৃণমূল নেতা হিসেবে জাহির করার ঝুঁকি আর কেউ নিতে চাইছেন না। পাছে আমজনতার ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়, সেই ভয়েই রাতারাতি ড্যাশবোর্ড ফাঁকা করে দিয়েছেন নেতারা।

বিজেপি ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া:

বিজেপি নেতা সুনীল রুদ্র মণ্ডল এবং অরূপ দাসের কথায়, “ড্যাশবোর্ডে ব্যাজ রেখে ক্ষমতা জাহির করা ও পুলিশকে ভয় দেখানোই ছিল তৃণমূলের সংস্কৃতি। যাঁরা এই ব্যাজ লাগিয়ে ঘুরতেন, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। বিজেপি এই কলঙ্কিত সংস্কৃতি কখনওই গ্রহণ করবে না।”

অন্যদিকে, পুলিশ কর্তারাও আড়ালে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, এই ব্যাজ কালচারের কারণে রাস্তায় ডিউটিতে থাকা নিচুতলার এএসআই বা এসআই-রা একটা মানসিক চাপে থাকতেন। তবে বর্তমানে সরকার বদলাতেই সেই অলিখিত ক্ষমতার দাপট এক লহমায় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *