৭৪ বছর আগের সেই ট্রাঙ্ক রহস্য! আজও কাচের জারে কেন বন্দি এক প্রেমিকের কাটা মুণ্ডু?

৭৪ বছর আগের সেই ট্রাঙ্ক রহস্য! আজও কাচের জারে কেন বন্দি এক প্রেমিকের কাটা মুণ্ডু?

চেন্নাই: মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মিউজিয়ামের একটি অন্ধকার ঘরের ধুলোমাখা কাঠের র‌্যাক। সেখানে রাখা একটি কাচের জারের গায়ে লেখা ‘M11’। জারের ভেতরের হলদেটে ফর্মালিনে ভেসে রয়েছে আড়াআড়িভাবে কাটা এক মানুষের মাথার অংশ। একটি চোখ, নাকের খানিকটা আর ঠোঁটের ভাঙা রেখা— দেখলে আজও গা শিউরে ওঠে। এর সাথে কোনো ফাইল বা সরকারি নথি নেই। কিন্তু এই কাটা মাথাটিই বহন করছে অপরাধ ইতিহাসের এক রোমহর্ষক অধ্যায়, যা আজ ৭৪ বছর পরেও ফরেনসিক চিকিৎসকদের গবেষণার এক বড় বিষয়।

এই কাটা মাথার মানুষটির নাম সি আলভান্দর। ১৯৫২ সালের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড কাঁপিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন মাদ্রাজকে। আজ ডিএনএ টেস্ট বা জেনেটিক প্রোফাইলিংয়ের যুগে অপরাধী চেনা সহজ হলেও, সেই সময়ে শুধুমাত্র ফরেনসিক বিজ্ঞানের জোরে কীভাবে খুনের কিনারা হয়েছিল, এটি তারই এক ক্লাসিক উদাহরণ।

সবুজ ট্রাঙ্ক ও সৈকতের বালি থেকে উদ্ধার দেহাংশ:

ঘটনার শুরু ১৯৫২ সালের ২৯ আগস্ট। মাদ্রাজ থেকে কলম্বোগামী ‘ইন্দো-সিলন এক্সপ্রেস’-এর একটি সবুজ ট্রাঙ্ক থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে দেখেন যাত্রীরা। মানামাদুরাই স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে পুলিশ ট্রাঙ্কের ডালা খুলতেই সবার চক্ষু চড়কগাছ! ভেতরে পড়ে রয়েছে এক ব্যক্তির মুণ্ডহীন দেহ। এর ঠিক কয়েকদিন পর রায়াপুরম সমুদ্র সৈকতের বালি খুঁড়ে উদ্ধার হয় একটি কাটা মাথা।

তদন্তের দায়িত্ব পড়ে মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডা. সিবি গোপালকৃষ্ণনের ওপর। তিনি নিখুঁত পরীক্ষার পর নিশ্চিত করেন, মাথা ও ধড় একই ব্যক্তির। মৃত ব্যক্তির ডান কানে দুটি ও বাঁ কানে একটি ফুটো এবং পায়ের বিশেষ চিহ্ন দেখে তাঁর স্ত্রী দেহটি শনাক্ত করেন। জানা যায়, মৃত ব্যক্তি পেশায় পেন বিক্রেতা সি আলভান্দর।

ত্রিকোণ প্রেম ও নির্মম পরিণতি:

পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, ৪০ বছর বয়সী আলভান্দরের একাধিক মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন দেবকী মেনন নামের এক বিবাহিত নারী। দেবকীর সঙ্গ পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিলেন আলভান্দর। ১৯৫২ সালের ২৮ আগস্ট দেবকীর বাড়িতে যাওয়ার পরই তাঁকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে ধড় থেকে মাথা আলাদা করে বালি চাপা দেওয়া হয় সৈকতে, আর শরীর ট্রাঙ্কে ভরে তুলে দেওয়া হয় ট্রেনে। এই মামলায় দেবকীর স্বামীর ৭ বছর এবং দেবকীর ৩ বছরের জেল হয়।

মৃত্যুর পরেও ফরেনসিকের ‘শিক্ষক’:

মামলা শেষ হলেও আলভান্দরের গল্প শেষ হয়নি। ফরেনসিক শিক্ষার স্বার্থে তাঁর মাথাটি সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু রহস্য আরও বাড়ে, যখন কোনো এক অজানা কারণে সংরক্ষিত মাথাটিকে লম্বালম্বিভাবে দু’ভাগ করা হয়। যার একটি অংশ থেকে যায় চেন্নাইয়ে এবং অন্য অংশটি পাঠানো হয় মাদুরাইয়ের একটি মেডিক্যাল কলেজে।

আজও কাচের জারের ভেতরে নিশ্চুপ ভেসে থাকা সেই কাটা মাথার অংশটি কেবল একটি অপরাধের স্মারক নয়, বরং ফরেনসিক বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নীরব শিক্ষক হয়ে রয়ে গেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *