টিসিএস কর্মীর মর্মান্তিক পরিণতিতে কাঠগড়ায় কর্পোরেট মানসিক নির্যাতন!

পুণেতে বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা টিসিএস-এর (TCS) এক অভিজ্ঞ কর্মীর আত্মহত্যার ঘটনা কর্মক্ষেত্রের অন্দরে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর মানসিক নির্যাতন ও বিষাক্ত পরিবেশকে আবারও প্রকাশ্যে এনেছে। গত ২ জুন নিজের বাড়ি থেকে ৪৮ বছর বয়সী অমিত অভয় ব্রহ্মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এটি কেবল একটি আত্মহননের ঘটনা নয়, বরং কর্পোরেট সংস্কৃতির অন্ধকার দিক এবং কর্মীদের মানসিক সুরক্ষার অভাবের এক জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে।
পুলিশি তদন্তে অমিতের ঘর থেকে দুই পাতার একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে, যা এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলোকে স্পষ্ট করে। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কর্মক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন। তাঁর অভিযোগের তির মূলত তিন সহকর্মীর বিরুদ্ধে, যাঁদের অনবরত হেনস্তা ও চক্রান্তের কারণে তিনি এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।
কাজের চাপ নাকি পরিকল্পিত কোণঠাসা করার কৌশল
উদ্ধার হওয়া চিঠিতে অমিত যে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর দাবি, অত্যন্ত সফল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হতো। পরিবর্তে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো এমন সব কাজ, যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা কোনো মানুষের পক্ষেই প্রায় আসাম্ভব। এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল কর্মক্ষেত্রে তাঁর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।
নির্যাতনের মাত্রা এখানেই শেষ থাকেনি। অমিত লিখেছেন, তাঁকে প্রতিনিয়ত সহকর্মীদের সামনে অপমানিত হতে হতো এবং চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনবরত মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি, যাঁকে তিনি বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবতেন, সেই সহকর্মীও মিথ্যে অভিযোগ এনে অফিসে তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চালান। এই লাগাতার অপমান ও কোণঠাসা হয়ে পড়ার গ্লানি সহ্য করতে না পেরেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
তদন্ত ও কর্পোরেট সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ অভিযুক্ত তিন জনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মামলা দায়ের করেছে। সংস্থার অভ্যন্তরীণ বিষয়, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ খতিয়ে দেখে তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। তবে এই ঘটনা দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের একটি শীর্ষ সংগঠন এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলে সরব হয়েছে। তাদের বক্তব্য, চলতি বছরের শুরুতেও একই সংস্থার এক তরুণ কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একই প্রতিষ্ঠানে দুই কর্মীর এমন পরিণতি মোটেও স্বাভাবিক নয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশের নামী কর্পোরেট সংস্থাগুলোতে কর্মীদের মানসিক চাপ চিহ্নিত করার বা অভ্যন্তরীণ অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে কাজের পরিবেশের সংস্কার এবং কর্মীদের মানসিক সুরক্ষায় কঠোর আইন না আনলে, আগামীদিনে এই ধরণের ট্র্যাজেডি আরও বাড়তে পারে।