অসহিষ্ণু বিশ্বে ছিন্নমূল প্রেমের গল্প শোনালেন ইমতিয়াজ, মন কাড়ল ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’!

অসহিষ্ণু বিশ্বে ছিন্নমূল প্রেমের গল্প শোনালেন ইমতিয়াজ, মন কাড়ল ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’!

যুদ্ধ, অশান্তি আর অসহিষ্ণুতার এই যুগে দাঁড়িয়ে আরও একবার এক চিরন্তন ও মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প পর্দায় ফুটিয়ে তুললেন পরিচালক ইমতিয়াজ আলি। তাঁর নতুন ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ কেবল একটি সাধারণ প্রেমের আখ্যান নয়, বরং দেশভাগের যন্ত্রণা, স্থানচ্যুতির হাহাকার এবং নিজের জন্মভিটের টানের এক অনন্য দলিল। নয়নিকা মাহতানির সঙ্গে যৌথভাবে লেখা ইমতিয়াজের এই চিত্রনাট্য দেশভাগের সেই প্রজন্মগত মানসিক আঘাতকে পর্দায় জীবন্ত করেছে, যা পাঞ্জাব ও বাংলার পূর্বপুরুষেরা আজীবন বুকে বয়ে বেরিয়েছেন।

অ্যালঝাইমার্সের স্মৃতি বনাম দেশভাগের ক্ষত

ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে ৯৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ ইশার সিং গ্রেওয়ালকে (নাসিরুদ্দিন শাহ) কেন্দ্র করে। তিনি অ্যালঝাইমার্স আক্রান্ত, শরীর চলে না এবং স্মৃতিভ্রান্তির ভারে মন ক্লান্ত। তাঁর সার্বক্ষণিক বিড়বিড়ানি দুই ছেলে ইকবাল (রজত কাপুর), অঙ্গদ (জয়প্রীত সিং) ও বৌমা মেহেরের (অঞ্জনা সুখানি) কাছে অর্থহীন প্রলাপ মনে হলেও, নাতি নির্বৈর (দিলজিৎ দোসাঞ্জ) ঠাকুরদার এই যন্ত্রণাকে অনুভব করতে পারে। ইশারের অবচেতন মন পড়ে রয়েছে তাঁর জন্মের মাটি সারগোদায়।

নির্বৈর ঠাকুরদার কথার সূত্র ধরে ফিরে যেতে থাকে দেশভাগের আগের সেই দিনগুলিতে। যেখানে ১৭ বছরের কিশোর কিনু ওরফে ইশার (বেদাঙ্গ রায়না) ভালোবেসেছিল আফসানা ওরফে জিয়াকে (শর্বরী ওয়াঘ)। উর্দুতে আনাড়ি হলেও জিয়ার জন্য শায়েরি লিখত কিনু। দেশভাগের নৃশংস বাস্তবতাকে তোয়াক্কা না করে কিনু জিয়াকে কথা দিয়েছিল, সে ফিরে আসবেই। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ফিরে আসার লড়াই নিয়েই এগিয়েছে ছবির গল্প।

অভিনয়ের ম্যাজিক ও রহমানের সুরের জাদু

পরিচালক ইমতিয়াজ আলি এই ছবির কাস্টিং ও নির্মাণে এক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন। ছবির মূল আকর্ষণগুলি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • নাসিরুদ্দিন শাহের অনবদ্য অভিনয়: মানসিকভাবে সাদাত হাসান মান্টোর বিখ্যাত ‘টোবা টেক সিং’-এর ধাঁচে গড়া ইশারের চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ প্রমাণ করেছেন কেন তিনি ভারতের অন্যতম সেরা অভিনেতা। প্রায় পঙ্গু এক বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি কেবল চোখের চাউনি দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন ফেলে আসা দিনের আকুলতা।
  • বেদাঙ্গ ও শর্বরীর যুগলবন্দি: প্রবীণ নাসিরুদ্দিনের কিশোর বেলার চরিত্রে বেদাঙ্গ রায়না নিজের অভিনয়ে সেই একই আবেগী চাউনি ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, শর্বরীর চঞ্চল ও প্রাণোচ্ছ্বল আফসানা চরিত্রটি এই ছবির অন্যতম প্রাণভোমরা।
  • দিলজিৎ দোসাঞ্জের নিখাদ অভিনয়: নাতির চরিত্রে দিলজিতের অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক এবং সাবলীল যে তা সহজেই দর্শকের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে।
  • এ আর রহমানের সঙ্গীত: ছবির অন্যতম বড় শক্তি এ আর রহমানের সুর, যা প্রতিটি দৃশ্যকে এক আলাদা মাত্রায় নিয়ে যায় এবং গানগুলি দীর্ঘক্ষণ হৃদয়ে গেঁথে থাকার মতো।

বাণিজ্যিক ধারার বাইরে এক অনন্য ব্যতিক্রম

আজকের ‘অ্যানিম্যাল’ কিংবা ‘ধুরন্ধর’-এর মতো নৃশংসতা ও হিংসানির্ভর ছবির সাফল্যের জোয়ারে ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ নিঃসন্দেহে এক বড় ব্যতিক্রম। যে পরিচালক দর্শকদের ‘যব উই মেট’, ‘তামাশা’ কিংবা ‘হাইওয়ে’-র মতো ক্লাসিক ছবি উপহার দিয়েছেন, তিনি যে বক্স অফিসের বাণিজ্যিক সমীকরণের তোয়াক্কা না করে নিজের চেনা ছকেই গল্প বলবেন, তা বলাই বাহুল্য। চিত্রনাট্যে সামান্য খামতি থাকলেও ইমতিয়াজের এই ‘লাভ ব্যালাড’ বা প্রেমের গাথা দর্শকের মনে দাগ কেটে যাবে অনেকদিন। আর হ্যাঁ, ছবি শেষে এন্ডক্রেডিট মিস না করার পরামর্শ দিচ্ছেন সিনেমা প্রেমীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *