জনকল্যাণ শিবিরে প্রকাশ্য বিজেপির তুমুল কোন্দল! চরম অপমানে স্থান ছাড়লেন জেলা কমিটির সদস্য

জনকল্যাণ শিবিরে প্রকাশ্য বিজেপির তুমুল কোন্দল! চরম অপমানে স্থান ছাড়লেন জেলা কমিটির সদস্য

রাজ্য জুড়ে নতুন সরকারের ‘জনকল্যাণ শিবির’ শুরু হতেই এবার সরকারি কর্মসূচির মঞ্চেই প্রকাশ্যে চলে এলো বিজেপির অন্দরের তীব্র গোষ্ঠী কোন্দল। দলেরই জেলা সম্পাদকের কাছে চরমভাবে অপমানিত হয়ে মাথা নিচু করে মঞ্চ ছাড়তে বাধ্য হলেন এক বর্ষীয়ান আদি বিজেপি নেতা তথা জেলা কমিটির সদস্য। বীরভূমের মুরারই ১ নম্বর ব্লকের এই নজিরবিহীন ঘটনায় সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক মহলের অন্দরে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারি শিবিরের সূচনাতেই ধুন্ধুমার পরিস্থিতি

সোমবার থেকে গোটা রাজ্যের পাশাপাশি মুরারই ১ ব্লকেও ঘটা করে সরকারি জনকল্যাণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক মোশারফ হোসেন, বিডিও এইচ এম রিয়াজুল হক, বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য অরিণ দত্ত এবং বিগত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী রিঙ্কি ঘোষ প্রমুখ।

বিধায়ক প্রদীপ প্রজ্বলন করে শিবিরের আনুষ্ঠানিক সূচনা করার পর যখন সাধারণ মহিলাদের হাতে গাছের চারা তুলে দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই শিবিরের অব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের একাংশ। প্রখর রোদের মধ্যে মানুষের জন্য কোনও ছাউনি না থাকা এবং মাইকিং করা সত্ত্বেও বিধবা ও বার্ধক্যভাতার আবেদন না নেওয়ার কারণে মঞ্চের সামনেই তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয়।

‘এখান থেকে হটেন!’ আঙুল উঁচিয়ে আদি নেতাকে তোপ সম্পাদকের

পরিস্থিতি যখন এমনিতেই উত্তপ্ত, ঠিক তখনই সভাস্থলে প্রবেশ করেন বিজেপি প্রার্থীর স্বামী তথা দলের জেলা সম্পাদক হেমন্ত ঘোষ। মঞ্চে আদি বিজেপি নেতা অরিণ দত্তকে বসে থাকতে দেখেই চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। অরিণবাবুর দিকে সরাসরি আঙুল উঁচিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চেই তিনি চিৎকার করে বলেন, “হটেন এখান থেকে! কংগ্রেসের হয়ে ভোট করবে আর এলাকায় বিজেপি বিজেপি করবে!”

এই মন্তব্যের পর হেমন্তবাবুর অনুগামীরা অরিণ দত্তর বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাতে শুরু করলে পরিস্থিতি কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষমেশ প্রশাসনিকভাবে শান্তি বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে বিডিও এইচ এম রিয়াজুল হক অপমানিত অরিণবাবুকে মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার অনুরোধ করেন। সরকারি মঞ্চে নিজের দলেরই এক শীর্ষ নেতার কাছ থেকে এমন অবমাননাকর আচরণের শিকার হওয়া অরিণবাবুর কাছে অত্যন্ত লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়।

দুই নেতার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও সাফাই

এই বেনজির ঘটনা নিয়ে জেলা সম্পাদক হেমন্ত ঘোষ তাঁর আচরণের সপক্ষে সাফাই দিয়ে বলেন, “আমি সেই অর্থে কিছু বলিনি। এটা তো সরকারি কর্মসূচি, সেখানে শাসক বা বিরোধী কোনও রাজনৈতিক দলের লোকেদের এভাবে থাকা উচিত নয়। শিবিরে এসে দেখি মানুষ বিভ্রান্ত, প্রখর রোদ সত্ত্বেও কোনও ছাউনি নেই। এখানে পার্টি অফিসের আখড়া করলে চলবে না। অনেকের শরীর থেকে এখনও টিএমসির গন্ধ যায়নি। যাঁরা অযোগ্য তাঁদের ডেকে এনে বসানো হয়েছে, যাঁদের যোগ্যতা আছে তাঁদের কাজে লাগাতে হবে।”

can অন্যদিকে, চোখেমুখে ক্ষোভ নিয়ে মঞ্চ ছেড়ে চলে যাওয়া অরিণ দত্ত বলেন, “সরকারি আমন্ত্রণ পেয়েই আমি ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সরকারি প্রোটোকল বজায় রেখে সকলের চলা উচিত ছিল। আমার বিরুদ্ধে ওঁর কোনও ক্ষোভ বা অভিযোগ থাকলে সেটা সত্য না মিথ্যা তা দলের অন্দরে আলোচনা করতে পারতেন। প্রকাশ্য মঞ্চে এমন নোংরামি করায় দলের সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হলো। বিডিও বলায় আমি মঞ্চ ছেড়ে বাড়ি চলে আসি, তবে আমি চাই জেলা নেতৃত্ব এই বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করুক।”

নেপথ্যে রামনবমীর মিছিল ও আদি-নব্য দ্বন্দ্বের পুরোনো আঁচ

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অরিণবাবুর সঙ্গে হেমন্ত ঘোষের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আদায়-কাঁচকলায়। রামনবমীর মিছিলে তৃণমূলের মোশারফ হোসেনের সঙ্গে অরিণ দত্তকে একসঙ্গে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল, যা এই ক্ষোভের আগুনকে আরও উসকে দেয়। এছাড়া, রিঙ্কি ঘোষকে প্রার্থী হিসেবে মেনে না নেওয়া এবং দলীয় কার্যালয়ে তালা ও ঝোলানোর পেছনেও অরিণবাবুর মদত ছিল বলে অভিযোগ তোলে হেমন্ত শিবিরের অনুগামীরা। বিধানসভা ভোট মিটে যাওয়ার পরও সেই ক্ষোভের রেশ যে এতটুকু কমেনি, সরকারি মঞ্চের এই চরম সংঘাতই তার বড় প্রমাণ। প্রকাশ্য মঞ্চে দলীয় কোন্দল এভাবে আছড়ে পড়ায় বিজেপির দলগত শৃঙ্খলা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *