উধাও সিন্ডিকেট, স্বস্তিতে প্রমোটাররা! এবার কি কলকাতায় সস্তা হচ্ছে ফ্ল্যাট?

কলকাতা: রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেই আমূল বদলে গেল বহুচর্চিত ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর চেনা ছবি। বাংলায় বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই রাজপথ থেকে অলিগলি— রাতারাতি ভোলবদল নির্মাণ শিল্পের। প্রমোটারদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আগে যেখানে তোলাবাজির নালিশ জানালে পুলিশ আপস করার পরামর্শ দিত, এখন সেখানে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, ‘এক টাকাও তোলা দেবেন না।’
ইএম বাইপাস সংলগ্ন একাধিক বড় প্রকল্পের কর্তারা জানাচ্ছেন, গত কয়েক সপ্তাহে স্থানীয় সিন্ডিকেট নেতাদের আর টিকিও দেখা যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো কোনো বড় নেতা আপাতত গ্রামে গিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে সিন্ডিকেটের এই হঠাৎ অন্তর্ধানে সাপ্লাই চেইনে সাময়িক কিছু সমস্যা হলেও, নতুন সরবরাহকারীরা সঠিক মাপ ও গুণমান বজায় রেখেই বালি-সিমেন্ট দিচ্ছেন, যা আগে ভাবাই যেত না।
কোটি কোটি টাকার তোলাবাজি ও বালির জালিয়াতি:
নির্মাণ শিল্পের দাবি, সিন্ডিকেটের তোলাবাজির বহর ছিল আকাশছোঁয়া। বাইপাসের একটি ৩০০ কোটি টাকার প্রজেক্টে শুধু সিন্ডিকেটকেই দিতে হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি টাকা! এমনকি বাইরে থেকে আসা রেডি-মিক্স কংক্রিটের প্রতি কন্টেইনার পিছু ১,২০০ টাকা করে ‘ফি’ বাঁধাধরা ছিল। প্রতিবাদ করলেই কাজ বন্ধের হুমকি দেওয়া হতো। এখানেই শেষ নয়, বালির বিল পুরো টাকার নেওয়া হলেও বাস্তবে ৭০ শতাংশের বেশি মাল দেওয়া হতো না।
ফ্ল্যাটের দাম কি কমবে?
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ত আবাসন শিল্পে। রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলির অভিযোগ, কলকাতা ও নিউ টাউনের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রতি বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত সিন্ডিকেট খরচ চাপিয়ে দেওয়া হতো। এই কৃত্রিম বাড়তি খরচের খেসারত দিতে হতো সাধারণ মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদেরই। ফলে সিন্ডিকেট রাজ খতম হলে কলকাতায় ফ্ল্যাটের দাম কমবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
রেহাই পাননি সাধারণ মানুষও:
শুধু বড় প্রমোটার নয়, পাটুলির এক প্রবীণ দম্পতি বাড়ি রং করতে গেলেও সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে ১ লক্ষ টাকা দাবির মুখে পড়েন। আবার সাধারণ মানুষের বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রেও বর্গফুট পিছু ৩০ টাকা পর্যন্ত তোলা দিতে হতো।
কাউন্সিলররা গ্রেপ্তার, কিন্তু মূল কাঠামো কি ভাঙল?
ইতিমধ্যেই তোলাবাজি ও অপরাধমূলক কাজের অভিযোগে কলকাতা ও বিধাননগর পুর এলাকার অন্তত ১২ জন তৃণমূল কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, মাঠপর্যায়ের বহু সিন্ডিকেট সদস্য এখনও অধরা।
শিল্পমহলের আশা ও আশঙ্কা:
রাজ্য সরকারের এক শীর্ষ মন্ত্রীর মতে, বিনিয়োগ টানতে হলে তোলাবাজি বন্ধ করা জরুরি। পুলিশের এই কড়া মনোভাবকে স্বাগত জানাচ্ছে রিয়েল এস্টেট মহল। তবে তাদের মনে একটা আশঙ্কার মেঘও রয়েছে— পুরনো সিন্ডিকেট চক্র যদি স্রেফ রাজনৈতিক রং বদলে নতুন শাসকদলের ছায়ায় আবার মাথাচাড়া দেয়, তবে পরিস্থিতির কোনও স্থায়ী বদল হবে না। তাই আপাতত ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতিতেই হাঁটছেন বিনিয়োগকারীরা।