দল ভাঙার সংকটে মমতার ত্রাতা হুমায়ুন? রেজিনগর আসন ছাড়ার নজিরবিহীন প্রস্তাব!

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর মাত্র এক মাস পেরোতেই নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। শোচনীয় নির্বাচনী পরাজয়ের পর একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দলের অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ২০ জন লোকসভা সাংসদ ইতিমধ্যেই দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (AIJEUP) সভাপতি হুমায়ুন কবির। একসময় যাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন মমতা, সেই হুমায়ুন কবিরই এখন তৃণমূল নেত্রীকে বিধানসভায় ফেরাতে নিজের আসন ছেড়ে দেওয়ার এক বড়সড় প্রস্তাব দিয়েছেন।
রেজিনগর আসন ছেড়ে মমতাকে বিধানসভায় পাঠানোর অফার
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এআইজেইউপি (AIJEUP) প্রধান হুমায়ুন কবির স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ভবানীপুর আসনে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনরায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। তবে তৃণমূল নেত্রী যদি চান, তবে তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় হুমায়ুন সবরকম সাহায্য করতে প্রস্তুত।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য হুমায়ুন কবিরের দেওয়া বিশেষ প্রস্তাবগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- রেজিনগর আসন ত্যাগ: হুমায়ুন কবির মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর কেন্দ্রের বর্তমান বিধায়ক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি রাজি হন, তবে তিনি বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আসনটি শূন্য করে দেবেন, যাতে সেখান থেকে উপনির্বাচনে দাঁড়িয়ে মমতা অনায়াসে বিধানসভায় পৌঁছে যেতে পারেন।
- বসিরহাটে নিঃশর্ত সমর্থন: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি রেজিনগর ছেড়ে বসিরহাট কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলেও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি সেখানে কোনও প্রার্থী দেবে না এবং তৃণমূল সুপ্রিমোকে জেতাতে পূর্ণ সমর্থন জানাবে।
- নন্দীগ্রাম নিয়ে হুঁশিয়ারি: হুমায়ুন কবিরের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি পুনরায় নন্দীগ্রাম থেকে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তিনি কোনওভাবেই জিততে পারবেন না। তাই মুর্শিদাবাদের রেজিনগরই তাঁর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আসন।
বহিষ্কারের পুরনো তিক্ততা ভুলে নরম হুমায়ুন
political মহল মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, হুমায়ুন কবির একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। কিন্তু দলীয় কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ বিতর্কের জেরে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।
“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সত্যিই আমার কাছে রাজনৈতিক সাহায্য চান, তবে আমি রেজিনগর থেকে তাঁকে পুনরায় বিধানসভায় নির্বাচিত হতে সর্বাত্মক সাহায্য করতে পারি। বিপদের দিনে আমি ওঁর পাশে দাঁড়াতে তৈরি।”
— হুমায়ুন কবির, সভাপতি, এআইজেইউপি
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর হুমায়ুন কবির নিজের নতুন দল এআইজেইউপি গঠন করে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে ২০২৬-এর এই মেগা সংকটের দিনে পুরনো সমস্ত ক্ষোভ ও তিক্ততা ভুলে মমতার প্রতি তাঁর এই নরম মনোভাব এবং আসন ছাড়ার প্রস্তাব রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
তৃণমূলের অন্দরে মহাবিপর্যয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক পরিকাঠামোয় কার্যত ধস নেমেছে। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর প্রায় ৫৮ জন সাংসদ ও হেভিওয়েট নেতা খোদ মমতা ও অভিষেকের বিরুদ্ধে খোলাখুলি প্রচার শুরু করেছেন। ভবানীপুরে নিজের খাসতালুকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে হেরে যাওয়ার ধাক্কা সামলাতে মমতা যখন হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন, তখন হুমায়ুন কবিরের এই প্রস্তাবকে তিনি আদৌ গ্রহণ করবেন কি না, সেটাই এখন দেখার। তৃণমূলের এই চরম দুর্দিনে দলছুট এক প্রাক্তন সতীর্থের দেওয়া এই রাজনৈতিক প্রস্তাব গ্রহণ করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেত্রীর পক্ষে কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে বঙ্গ রাজনীতির অন্দরে।