জি-৭ পার্শ্ববৈঠকের আগে ট্রাম্পের মুখে মোদির প্রশংসা, কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ!

ফ্রান্সে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পার্শ্ববৈঠকের আগেই বিশ্বমঞ্চে এক নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যান্য বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূয়সী প্রশংসা করে এক নতুন কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। একটি আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়ে ট্রাম্প নিজের স্বভাবের সঙ্গে মোদির চরিত্রের বৈপরীত্য তুলে ধরে মন্তব্য করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি অত্যন্ত শান্ত, স্থিতধী এবং কঠোর ও দক্ষ প্রশাসক। নিজের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি রসাত্মকভাবে বলেন যে, সবার নজর যেন তাঁর দিকে না থেকে বরং মোদির দিকেই থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ও বিনয়ী প্রশংসাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা দুই দেশের সাম্প্রতিক ঠান্ডা লড়াইয়ের ‘ক্ষতে প্রলেপ’ দেওয়ার সুনিপুণ চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
এই প্রশংসার পেছনে সাম্প্রতিক একটি প্রচ্ছন্ন কূটনৈতিক টানাপড়েন কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে বিশ্বনেতাদের সামনে প্রধানমন্ত্রী মোদি নাম না করে ট্রাম্প প্রশাসনকে এক প্রকার কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। বাণিজ্যিক জলপথে ভারতীয় নাবিকদের প্রাণহানি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে মোদি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে, জলপথের নিরাপত্তা ও নাবিকদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। মোদির এই কঠোর অবস্থান ও স্পষ্ট বার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নমনীয় মন্তব্য মূলত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব
ট্রাম্প ও মোদির এই সম্ভাব্য পার্শ্ববৈঠকের দিকে বর্তমানে পুরো বিশ্ব গভীর নজর রাখছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ দুই দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ। গত আড়াই দশকে ভারতের পণ্যের জন্য আমেরিকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছর যেখানে আমেরিকায় ভারতের রপ্তানি ছিল মাত্র ১০.৯ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৮৭.২ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আমেরিকা থেকে ভারতের আমদানি ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫২.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও, তা রপ্তানি বৃদ্ধির হারের সমকক্ষ নয়। ফলে ভারতের সাথে আমেরিকার এই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ওয়াশিংটনের জন্য একটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বজায় রাখতে ওয়াশিংটন যখন প্রতিনিয়ত নতুন উপায় খুঁজছে, তখন ভারতের জ্বালানি খাতের ওপর দুই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। নয়াদিল্লি ধারাবাহিকভাবে আমেরিকা থেকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি বাড়িয়ে চলেছে, যা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত লাভজনক একটি খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের এই সৌজন্যমূলক অবস্থান দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও মসৃণ করতে পারে। এই পার্শ্ববৈঠক কেবল ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর পথই প্রশস্ত করবে না, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।